জসিম উদ্দিন : কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজার জেলা খাদ্য বিভাগে ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম এখন আর প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি রীতিমতো একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, এমন ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোঃ আবু কাউছারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ না করে তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিবাজ চক্র কাগজে-কলমে ভুয়া ধান ক্রয় দেখিয়ে চাল সংগ্রহে গুদাম কর্মকর্তাদের জিম্মি করে রেখেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই জালিয়াতির ফলে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত কিছু চালকল মালিকরা তথাকথিত ছাঁটাই ও কৃত্রিম লোকসানের হিসাব দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন। খাদ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে কথা বলতে না পারলেও অভ্যন্তরীণভাবে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ পোষণ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকার যখন ধান-চাল সংগ্রহ ত্বরান্বিত করার জন্য বারবার তাগিদ দিচ্ছে, ঠিক তখনই জেলা খাদ্য কর্মকর্তা নিজের পছন্দের কয়েকজন মিলারকে সুবিধা দিতে সাধারণ মিলারদের( মিল মালিক) বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালকল মালিক অভিযোগ করেন, যারা কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের চাল গুদামে নেওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অজুহাতে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে বরাদ্দ আদেশ বিলম্বিত করায় বাজারে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং সাধারণ মিলাররা( মিল মালিক) মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এতে পুরো মিলার সমাজের মধ্যে ক্ষোভ এখন বিস্ফোরণমুখী।
আরও বিস্ময়কর অভিযোগ হলো, বিধি অনুযায়ী এক উপজেলার বরাদ্দ অন্য উপজেলায় স্থানান্তর করতে হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কমিশন বাণিজ্যের বিনিময়ে এক উপজেলার চাল অন্য উপজেলায় সরিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত সভায় গৃহীত হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কার ক্ষমতায়, কোন স্বার্থে এই বরাদ্দ বাণিজ্য চলেছে?
ওএমএস কার্যক্রম নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সারা দেশের প্রায় সব জেলায় নতুন ওএমএস ডিলার নিয়োগ সম্পন্ন হলেও কক্সবাজার জেলার সদর, চকরিয়া ও পেকুয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির করে রাখা হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিন মাস অন্তর বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে হাইকোর্টের জালিয়াত চক্র ব্যবহার করে পুরনো ডিলারদের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যাতে নতুন নিয়োগ না হয় এবং লুটপাট অব্যাহত থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই পুরো অনৈতিক ব্যবস্থার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়ক জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোঃ আবু কাউছার নিজেই।
অতীতেও তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সূত্র মতে, তিনি একসময় নিজের স্থায়ী ঠিকানার তথ্য জালিয়াতি করে খাদ্য বিভাগের বদলি নীতিমালাকে প্রকাশ্যে উপহাস করে নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা খাদ্য কর্মকর্তার পদ বাগিয়ে নেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও অর্থের বিনিময়ে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নিজের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটকে অক্ষত রাখতে পর্যাপ্ত উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও তিনি জেলা খাদ্য কর্মকর্তা হয়েও পেকুয়া, চকরিয়া ও টেকনাফ উপজেলার দায়িত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে না দিয়ে নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন। এতে করে খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরে ভয়, চাপ ও নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা দুর্নীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।সচেতন মহলের প্রশ্ন এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও কেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহল নীরব? দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে কক্সবাজারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে যাবে এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.