ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র কয়েক ঘণ্টার অভিযানে দেশটির সব থেকে বড় সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনার দুর্গের মতো সুরক্ষিত বাসভবন থেকে মাদুরোকে যেভাবে বন্দি করা হয়, তাতে অবাক হয়েছে পুরো বিশ্ব।
তবে সুরক্ষিত ও শক্তিশালী ওই ভবনে প্রবেশ করার পরিকল্পনা চলছিল বহু মাস ধরেই। ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ অভিযানের অংশ হিসাবে পাঁচ মাস ধরেই মাদুরোকে চোখে চোখে রাখেন মার্কিন গোয়েন্দারা।
তাকে বন্দির লক্ষ্যে গত আগস্টেই গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি গোপন দল প্রবেশ করে ভেনিজুয়েলায়। মাদুরোর চলাফেরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন তারা।
এরই মধ্যে আবার মাদুরোর ঘরেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন এক ‘গাদ্দার’। মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ওই ব্যক্তি প্রতিনিয়ত তথ্য পাচার করছিলেন সিআইএ-এর কাছে। ফলে মাদুরো কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন-এসব সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন বাহিনীর এই অভিযান এত সহজ হয়েছে মূলত এই বিশ্বাসঘাতকের কারণেই। খবর নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএনের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানে যৌথভাবে অংশ নেয় মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ডেল্টা ফোর্স, সিআইএ ও এফবিআই। বহু মাস ধরেই অভিযানের পরিকল্পনা চলছিল এবং এর অংশ হিসাবে বারবার মহড়া দেওয়া হয়।
কেনটাকি রাজ্যের এক গোপন স্থানে মাদুরোর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের হুবহু একটি নকল কাঠামো তৈরি করে ডেল্টা ফোর্স। সেখানেই মাদুরোকে অপহরণ মহড়া চালান তারা। দ্রুতগতিতে ইস্পাতের দরজা ভাঙার অনুশীলনও করেন। এদিকে সিআইএ-এর একটি ছোট দল গত আগস্ট থেকেই ভেনিজুয়েলায় সক্রিয় ছিল।
মাদুরোর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তির সহায়তায় তার (মাদুরো) দৈনন্দিন চলাফেরা, সময়সূচি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেন তারা। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, এই গোয়েন্দা তথ্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্র জানত মাদুরো কোথায় যান, কী খান, এমনকি কী ধরনের পোষা প্রাণী রাখেন।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ২৫ ডিসেম্বর অভিযানের অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। অবশেষে শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে চ‚ড়ান্ত নির্দেশ দেন ট্রাম্প।
অভিযান শুরু হয় সাইবার হামলার মাধ্যমে। এতে কারাকাসের বড় অংশ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্ধকারের আড়ালে বিমান ও হেলিকপ্টার সহজেই শহরের দিকে অগ্রসর হয়।
২০টি ঘাঁটি ও নৌজাহাজ থেকে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান, এফ-৩৫, এফ-২২, হেলিকপ্টার, ড্রোনসহ ১৫০টির বেশি সামরিক বিমান অংশ নেয়।
ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ে বিশেষায়িত বিমান, বি-১ সুপারসনিক বোমারু এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের আগাম সতর্কতা শনাক্তে সক্ষম অন্যান্য উড়োজাহাজ, যেমনটি ১৫ বছর আগে আল-কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা অভিযানের আগে করা হয়েছিল।
রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ভেনিজুয়েলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এ হামলায় সামরিক সদস্য ও বেসামরিকসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হন।
আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করার পর বিশেষ বাহিনীর হেলিকপ্টার মাদুরোর কম্পাউন্ডের দিকে এগিয়ে যায়। স্থানীয় সময় রাত ১টা ১ মিনিটে (কারাকাস সময় রাত ২টা ১ মিনিট) হেলিকপ্টারগুলো মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছায়। সেখানে গুলির মুখে পড়লেও ‘অপ্রতিরোধ্য শক্তি’ দিয়ে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন ভেনিজুয়েলার সেনারা। এতে একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো অভিযানে প্রায় ছয়জন মার্কিন সেনা আহত হন।
১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্টের ‘নাইট স্টকার্স’ ইউনিট ডেল্টা ফোর্সকে বহন করে আনে। ভবনের ভেতরে ঢোকার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ডেল্টা ফোর্স জানায়, তারা মাদুরোকে আটক করেছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দ্রুত হেলিকপ্টারে তুলে ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থানরত ইউএসএস আইও জিমা জাহাজে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের গুয়ানতানামো বে নৌঘাঁটিতে পাঠানো হয়।
পরে একটি সরকারি বিমানে নিউইয়র্কের উত্তরের একটি সামরিক নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতায় উড়ে দ্রুতগতিতে কারাকাসের দিকে এগিয়ে যায়।
হেলিকপ্টারগুলো যখন কম্পাউন্ডে পৌঁছায়, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস তখন ঘুমাচ্ছিলেন। মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় দরজা ভেঙে তাদের কক্ষে পৌঁছায় কমান্ডোরা। হঠাৎ অভিযানের শব্দে মাদুরো দম্পতি বিছানা ছেড়ে স্টিলের দরজার পেছনে থাকা একটি নিরাপদ কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু এরই মধ্যে ব্লোটর্চ ব্যবহার করে দম্পতির ওপর ‘ঝাঁপিয়ে পড়ে’ কমান্ডোরা। এরপর আত্মরক্ষায় আর কিছু করতে পারেননি তারা।
অপহরণের রূপরেখা: জুলাইয়ের মধ্যেই পরিকল্পনার রূপরেখা স্পষ্ট হতে থাকে। ‘ফেজ-১’-এ আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌযানে হামলার পরিকল্পনা ছিল। এটি পরিচালনার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের সিল টিম সিক্সের। ‘ফেজ-২’ ছিল আরও বেশি ভেনিজুয়েলাকেন্দ্রিক।
ডেল্টা ফোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন বিকল্প বাস্তবায়নের কথা ভাবা হয়। এর একটি ছিল মাদুরোকে অপহরণ, আরেকটি ছিল তেলক্ষেত্র দখল।
ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, মাদুরো অপহরণ অভিযানের কয়েক সপ্তাহ আগেই সেনাবাহিনীর কমান্ডো ও সিআইএ-এর বিশেষ ইউনিটগুলোকে ওই অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই বাহিনী যোগ দেয় সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা প্রায় ১৫ হাজার সেনা ও এক ডজনের বেশি নৌবাহিনীর জাহাজের সঙ্গে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.