নুসরাত জাহান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
গভীর রাত। চারদিকে স্তব্ধতা; শুধু ভেসে আসে টেলিভিশন ধারাভাষ্যকারের দ্রুতগতির বর্ণনা। ঘরে বসে থাকা দর্শকদের দম ছাড়ারও যেন অনুমতি নেই। একধরনের টানটান উত্তেজনা বিদ্যমান। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে সমস্বরে ভেসে আসে উল্লাস—“গোল!”
একটি আকস্মিক গোলে প্রতিপক্ষ দল এগিয়ে যায়। টেলিভিশনের পর্দার সামনে জেগে থাকা তরুণদের উচ্ছ্বাস, হতাশা ও উত্তেজনায় তখন রাতের নীরবতাও যেন হার মানে। চলছে ‘ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬’—তরুণদের আবেগ, উন্মাদনা ও রাতজাগা ভালোবাসার অন্যতম বড় আয়োজন।
বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি প্রতিযোগিতা বা খেলার নাম নয়; এটি শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের আবেগের নাম। মাঠের নব্বই মিনিটের লড়াই শেষ হলেও তার রেশ ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের হৃদয়ে, অলিগলিতে ও প্রতিদিনের কথোপকথনে।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মাঠে নামতে না পারলেও, বিশ্বকাপকে ঘিরে এ দেশের মানুষের উল্লাসের কোনো কমতি নেই। খেলা শুরু হতে না হতেই মুহূর্তে বদলে যায় দেশের অলিগলির চিত্র। রাস্তার ধারে, দোকানের সামনে কিংবা বাড়ির ছাদে—সবখানেই ঝুলতে দেখা যায় ভক্তদের প্রিয় দলের পতাকা।
তরুণ প্রজন্মের রিল্স তৈরির অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ ফুটবল। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে ও পতাকা হাতে আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যায় তিন বছরের ছোট্ট শিশুকেও। ঠিকভাবে কথা বলতে না পারলেও, আবেগের বশে কিংবা বাবা-মায়ের প্রভাবে তারা বেছে নেয় নিজেদের পছন্দের দল। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলের প্রতি সমর্থন বদলাতেও পারে; তবে বিশ্বকাপের আয়োজন উপভোগ করার আনন্দ তাদের মধ্যে থেকেই যায়।
তরুণদের কাছে বিশ্বকাপ যেন রাতজাগা এক উৎসব। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের মতো করে এই খেলা উপভোগ করেন। দেয়ালিকা ও চিত্রকলার মাধ্যমে তারা প্রিয় দল এবং বিশ্বকাপকে ঘিরে নিজেদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটান।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরাও এর ব্যতিক্রম নন। প্রিয় দলের পতাকা, জার্সি ও দেয়ালিকা অঙ্কনের মাধ্যমে তারা নিজেদের বিশ্বকাপ ফুটবলের আবহের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। এ বিষয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তৌফিক হাসান শুভ বলেন, “বিশ্বকাপ ফুটবল বাঙালির অন্যতম আবেগের জায়গা। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। আমার কাছে বিশ্বকাপের আমেজ ও পাগলাটে সমর্থকদের উল্লাস বরাবরই পছন্দের। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপকে ঘিরে যে চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, এককথায় তা অসাধারণ।”
একই বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মা চৈতি বলেন — প্রশ্নটি যদি অনুভূতি নয়, উচ্ছ্বাস হতো, তাহলে উত্তর দেওয়া হয়তো সহজ হতো। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধু কোনো অনুভূতি নয়; এটি বাঁধভাঙা উন্মাদনা, অনির্বচনীয় আনন্দ ও আবেগঘন উদ্যাপনের নাম। একজন আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ অন্য কারও হাতে না ওঠা পর্যন্ত আমরাই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন—এই গৌরব ভাষায় প্রকাশের অতীত। দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও আমাকে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে চারদিকে তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা ও প্রতিযোগিতামূলক আবহ আমাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রাজিলের সমর্থকদের সঙ্গে নিজেদের দলকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রাণবন্ত বিতর্ক আমার কাছে উপভোগ্য। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই ফুটবলের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত গ্রাফিতি অঙ্গন বিশ্বকাপের আবহকে আরও বর্ণিল করেছে। তাপসী রাবেয়া বসরী হলের আবাসিক ছাত্রী হিসেবে আমরা কমন রুমের বড় পর্দায় একসঙ্গে ম্যাচ উপভোগ করছি। এই মুহূর্তগুলো শুধু খেলা দেখা নয়; বরং সম্মিলিত উল্লাস, আবেগ ও স্মৃতির এক অনন্য উৎসব। এবারের বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি এমন এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা, যা হৃদয়ে দীর্ঘদিন অনুরণিত হয়ে থাকবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইফতেখার হোসেন খান বলেন— এটি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ, তাই এবারের অনুভূতিটা অন্যবারের চেয়ে আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ—একসঙ্গে খেলা দেখা, হৈচৈ করা এবং প্রিয় দল ও খেলোয়াড়কে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক যেন এরই অংশ। ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে আমার বিশেষ কোনো প্রত্যাশা নেই; আমার সব চাওয়া ২০২২ সালেই পূরণ হয়েছে। এবার শুধু লিওনেল মেসির খেলা উপভোগ করতে চাই। ববি ক্যাম্পাসের দেয়ালিকাটি পুরো ক্যাম্পাসে নতুন আলোড়ন তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে ছবি তুলে প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন ও বিশ্বকাপ উপভোগের অনুভূতি প্রকাশ করছে। এমন আরও দেয়ালিকা ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে রবিউল সিকদার বলেন— সারা বিশ্বের মতো বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে আকর্ষণীয় গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে। বিশেষ করে টিএসসি প্রবেশদ্বারে নির্মিত গ্রাফিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্বকাপের আমেজ ও উৎসাহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সুরাইয়া তাসনীম তার অনুভূতি ব্যক্ত করে জানান— আমি তো খুব বেশি উৎসাহী। বিশ্বকাপ চার বছর পরপর আসে, আর আমাদের মতো সিজনাল ফ্যানরা এই আনন্দকে আরও উচ্চমাত্রায় নিয়ে যায়। নিজের দলকে সমর্থন করা, খেলা দেখার জন্য অপেক্ষা করা, তারপর পুরো ৯০ মিনিট মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখা—সবকিছুই দারুণ অনুভূতির। ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কী হবে তা বলা কঠিন। আমি মেসিকে অনেক ভালোবাসি। তাঁর পায়ের জাদুর জন্যই আমি তাঁর ভক্ত। তিনি এত প্রাণবন্তভাবে খেলেন যে পুরো ম্যাচই উপভোগ করা যায়। আমি আশাবাদী, এবারও আমার দল আর্জেন্টিনা কাপ জিতবে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো: রায়হানুল ইসলাম সায়েম বলেন— পরীক্ষার কারণে খেলা দেখতে পারিনি। তবে বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশে এক অন্যরকম আমেজ তৈরি হয়। সবাই নিজের দলকে সমর্থন করে আনন্দ-উল্লাস করে। শহরের প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদ, দোকান ও রাস্তার পাশ বিভিন্ন দলের পতাকায় রঙিন হয়ে যায়। বিষয়টি আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় লাগে। তবে মাঝে মাঝে আনন্দের নামে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা যায়, যা মোটেও কাম্য নয়।
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রিয় দলকে খেলতে দেখার অনুভূতি একজন ভক্তের জন্য ভীষণ আবেগময়। প্রিয় দলের জয় সেই আবেগকে দ্বিগুণ করে তোলে। খেলায় হার-জিত থাকবেই; তা মেনে নিয়েও প্রিয় দলকে নিরন্তর সমর্থন করে যাওয়া ভক্তদের কাছে এই আয়োজন অত্যন্ত উপভোগ্য। নিজেদের মতো করে এই মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিতে পারাই তাদের কাছে এক বিশেষ প্রাপ্তি। মাঠের খেলা শেষ হলেও, বিশ্বকাপের সেই আবেগ থেকে যায় মানুষের স্মৃতি ও অপেক্ষার ভেতর।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.