দুধ খেলে হাড় মজবুত হয়—এ কথা ছোটবেলা থেকেই প্রায় সবাই শুনে বড় হয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দুধ নয়; সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিন এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তাই দীর্ঘমেয়াদে হাড়কে সুস্থ ও শক্ত রাখার মূল চাবিকাঠি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাড় দুর্বল হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার অনেক আগেই এর ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল মাসকিউলোস্কেলেটাল হেলথের অধ্যাপক কেট ওয়ার্ড বলেন, শৈশব ও কৈশোরে যত বেশি শক্তিশালী ‘বোন রিজার্ভ’ তৈরি হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ক্ষয়ের ঝুঁকি তত কম থাকে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব স্বাভাবিকভাবেই কমতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন। এই রোগে হাড় ধীরে ধীরে পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। রয়্যাল অস্টিওপোরোসিস সোসাইটির জুলি থম্পসনের ভাষ্য, এটি একটি ‘নীরব রোগ’। কারণ হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত সাধারণত এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
বিশেষ করে ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে হিপ ফ্র্যাকচার বা কোমরের হাড় ভাঙা একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। হাড় ভাঙার পর নিউমোনিয়া বা হৃদরোগের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর ঝুঁকি আরও বেড়ে গেলেও পুরুষরাও অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হতে পারেন।
টাফটস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বেস ডসন-হিউজ বলেন, একসময় অস্টিওপোরোসিসকে শুধু নারীদের রোগ মনে করা হলেও বর্তমানে দীর্ঘায়ুর কারণে পুরুষদের মধ্যেও এর প্রকোপ বাড়ছে।
হাড় ভালো রাখতে কী খাবেন?
দুধ, দই ও পনির
দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিন ডির অন্যতম ভালো উৎস। ২০০ মিলিলিটার এক গ্লাস দুধে প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বেশি দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ১১ শতাংশ এবং কোমরের হাড় ভাঙার ঝুঁকি ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক প্রায় ৭০০ থেকে ১,০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা প্রায় ১,২০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
সয়া ও টোফু
দুগ্ধজাত খাবার না খেলেও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। ১০০ গ্রাম টোফুতে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। সয়াতে থাকা আইসোফ্ল্যাভোন নামের উদ্ভিদ-যৌগ ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে, যা বিশেষ করে মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। ফারমেন্টেড সয়া খাবার ‘টেম্পে’ শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণেও সহায়তা করে।
চিয়া বীজ
চিয়া বীজে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। মাত্র এক টেবিল চামচ চিয়া বীজেই প্রায় ৯৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। ওমেগা-৩ শরীরের প্রদাহ কমিয়ে হাড় ক্ষয়ের গতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
শুকনো ফল
প্রুন, ডুমুর ও এপ্রিকটের মতো শুকনো ফলে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ পলিফেনল। গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছর নিয়মিত প্রুন খাওয়া নারীদের হাড়ের ক্ষয় তুলনামূলক কম হয়েছে।
ক্যানজাত সার্ডিন ও স্যামন
কাঁটাসহ ক্যানজাত সার্ডিন ক্যালসিয়ামের অন্যতম ভালো উৎস। ৬০ গ্রাম সার্ডিনে প্রায় ২৪০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। পাশাপাশি এসব মাছে রয়েছে ভিটামিন ডি ও উচ্চমানের প্রোটিন, যা হাড়ের পাশাপাশি পেশিও শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী পেশি থাকলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং হাড় ভাঙার আশঙ্কাও হ্রাস পায়।
সাপ্লিমেন্ট কি প্রয়োজন?
গবেষকদের মতে, সবার জন্য ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হয় না। যাদের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম নেই বা যাদের শরীরে সূর্যালোকের অভাবে ভিটামিন ডি ঘাটতি রয়েছে, মূলত তাদের ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত ভিটামিন ডি গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে এবং এতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করাই ভালো।
ভেগানদের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজি, তিল, ডাল এবং ক্যালসিয়াম-ফর্টিফাইড খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্টও নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাড় সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, নিয়মিত ওজন বহনকারী (ওয়েট-বেয়ারিং) ব্যায়াম করা এবং শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি নিশ্চিত করা। এতে বয়স বাড়লেও হাড়ের ক্ষয় ও ভাঙার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে রাখা সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.