ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে ১৭ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের জন্য ছয় মাস পূর্ণ মেয়াদের ১০ ভাগের এক ভাগ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের অঘটনবহুল ১৮ মাসের পর নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ অবশ্যই প্রত্যাশাবহুল ও ইতিবাচক ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর পরিমিত ও সহিষ্ণু আচরণ প্রশংসিত হয়েছে। সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ি আমদানি ও প্লট সুবিধা বন্ধে সংসদের প্রথম অধিবেশনে তাঁর ঘোষণা প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। যদিও এসব উদ্যোগের প্রায়োগিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অবশ্য সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বরাবরের মতো একাকার হয়েই রয়েছে। নির্বাচনের পর দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে বিএনপির রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। পক্ষান্তরে এ সময় বিরোধী জামায়াত-এনসিপি মাঠে অপেক্ষাকৃত সরব থেকেছে। বিএনপি নেতাদের অধিকাংশই মন্ত্রিত্ব ও অন্যান্য সরকারি দায়িত্বে যুক্ত হওয়ায় সংগঠনে মনোযোগী না হলেও দলীয় পদ ছাড়তে আগ্রহী নন।
যেমন জুন-জুলাইয়ে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা ও করপোরেশন এবং আটটি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে বিএনপির বর্তমান ও সাবেক ১৭ জন নেতা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন; কিন্তু তারা এখনও দলীয় পদ ছাড়েননি। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করে দলীয়করণ রোধের অঙ্গীকার করেছিল। এ যাবৎ অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে দলীয় অনুগত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়াসহ সরকারি সংস্থায় দলীয় নেতাদের পদায়ন সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, আমলাতন্ত্রে পেশাদারিত্ব ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়নেরও অন্তরায়।
২.
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের নতুন আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা নেই। বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন তা তদন্ত করতে পারবে না। উল্টো যে বাহিনী বা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের কাছেই প্রতিবেদন চাইবে।
এতে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা হুবহু প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে শৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের মুখাপেক্ষী করা হয়েছে। অন্যদিকে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনকে এড়িয়ে কেবল পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
যদিও গুমের ঘটনায় যাদের জড়িত থাকবার অভিযোগ ওঠে, তারা প্রায় সবাই শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। গুমের ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগের বিরুদ্ধে অধস্তন তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন বলে বলা হয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাই প্রক্রিয়া দলীয়করণের মূর্তিমান উদাহরণ; আট সদস্যের কমিটিতে বিরোধী দলের একজন এমপি ছাড়া সকলেই সরকারের প্রতিনিধি।
মূল্যস্ফীতি থেকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট– কোনোটিই গেল ছয় মাসে বর্তমান সরকারের সৃষ্ট নয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ও জাতীয় কিছু আকস্মিক সংকট। অভিযোগ উঠছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমলে উৎপাদন বাড়িয়ে ৩০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছুলেও সরবরাহ লাইন ১৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার কোন পদক্ষেপগুলো নিয়েছে? সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সংসদে স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।
ভোলাসহ সমুদ্র উপকূল অঞ্চলে গ্যাসক্ষেত্র থেকে অংশীজনদের পক্ষ থেকে গ্যাস আহরণে বারংবার দাবি জানানো সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আমলে আমদানির দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। জরুরি আমদানি, ঋণ ও ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি আপাতত সামলানোর যে চিরকালীন ‘সরকারি’ নীতি, সেখান থেকে বেরিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির উৎস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্রিড উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুতের কথা বরংবার বলা হয়; আদতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করে জোড়াতালি দিয়ে চলে সরকারের পর সরকার। এ ক্ষেত্রে যেহেতু মেগা প্রজেক্টের সম্ভাবনা নাই, তাই কোনো সরকারই এ ব্যাপারে মনোযোগী হয় না।
মনে রাখতে হবে, দেশের সাফল্য কেবল প্রবৃদ্ধির অঙ্কে বোঝালে হবে না। মানুষের প্রকৃত আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দেশের মূল সাফল্য। ‘কোটা না মেধা’ আন্দোলনের পথ বেয়ে চব্বিশের অসামান্য গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। গণতন্ত্রের জন্য বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম রয়েছে। বিএনপি সরকারকে বৈষম্যহীন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। সুশাসন ও জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের সোপান। সংকট লুকিয়ে রাখবার বা অস্বীকারের কোনো বিষয় নয়। গ্যাস বা বিদ্যুৎসহ যে কোনো সংকট জাতির সামনে পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরে অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সম্মিলিত প্রয়াসে সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা জাতিকে যূথবদ্ধ মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেবে। এই ক্ষেত্রে সরকারকে উত্তম ব্যবস্থাপকরূপেও আবির্ভূত হতে হবে।
আন্তর্জাতিক বা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারকে দায়িত্বের ছয় মাসে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়েছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ও ভারত-চীনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ বুঝে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে অভ্যন্তরীণ চটজলদি ও তরল লোকপ্রিয়তার চেয়ে দেশের সুদূরপ্রসারী স্বার্থ, বিনিয়োগ ও আন্তঃদেশীয় সম্পর্ককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া সংগত হবে।
ছয় মাস অতিক্রমকারী সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সরকার কেবলমাত্র বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নয়। দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সরকার হয়ে উঠতে হবে। নিজ মত ও ধর্ম, আচার ও আচরণ, অভ্যাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত হলেই দেশে সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.