গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা কতটুকু, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। গ্যাস থাকে না বলে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় এখন বিশেষত দিনের বেলায় উনুনে হাঁড়ি চড়ে না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত। মাঝখানে গ্যাসের অভাবে কিছুদিন তো শত শত কারখানা তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের ছুটিই দিয়ে দিয়েছিল। অনেক কারখানায় ছাঁটাইও হয়েছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়েও পুরোনো গল্প ফিরে এসেছে। যেখানে পল্লী বিদ্যুৎ আছে, সেখানে বিদ্যুতের বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের ‘মাধবী হঠাৎ কোথা হতে এল ফাগুন-দিনের স্রোতে।/ এসে হেসেই-বলে, ‘যা ই যা ই যাই’-এর মতো। কখন আসবে আবার কেউ জানে না। তবে আসার পর কখন যাবে, সেটি সবারই কমবেশি জানা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং দ্রুত সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন । আর চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে । অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে দেশের গ্যাস খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তাই এর পুরো দায় বর্তমান সরকারের ওপর চাপানো যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, অর্থমন্ত্রীর সময় চাওয়া কিংবা উপদেষ্টার আওয়ামী লীগের ওপর ‘দোষ’ চাপানো সবই হয়েছে। কিন্তু সংকটের সমাধান, যেটি ভুক্তভোগী জনগণের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত, অন্তত নিকট ভবিষ্যতে তা মিলছে না।
রাজনীতির মাঠেও এ নিয়ে নেই কোনো কার্যকর আওয়াজ। সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। তারাও এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করছে না। সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির সঙ্গে মিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া ছাড়া তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আধিপত্য ধরে রাখতে সক্রিয়। এ জন্য বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের সংঘর্ষও হয়েছে। অবশ্য সম্ভবত সরকার বা বিএনপির শীর্ষ মহলের নির্দেশে ছাত্রদল দ্রুতই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। গত নির্বাচনে জামায়াতের বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখালেও বিএনপির অনেক নেতা ইতোমধ্যে বহুবার বলেছেন, ‘পুরোনো বন্ধু’ জামায়াতের সঙ্গে মিলেমিশেই তারা দেশ চালাতে চান। জামায়াত একই মনোভাব পোষণ করে বলে মনে হচ্ছে। তারা বিএনপিকে সামনে রেখেই তাদের রাজনীতি নির্বিঘ্নে চালাতে চায়। জনগণের সমস্যাকে আমলে নিয়ে সরকারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টির পক্ষে তারা নয়। তাই সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনেও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ই বিরোধী দলের আলোচনায় স্থান পায়নি।
গণঅভ্যুত্থানের পর জন্ম নেওয়া দল এনসিপি বিভিন্ন সমাবেশে সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান গ্রহণের অভিযোগ আনলেও তাদের দিক থেকে এ বিষয়ে জনমত গঠনের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বেশ কয়েকবারই সরকার ‘ফেলে’ দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিলেও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের মতো জনদুর্ভোগ নিয়ে জনগণকে নিয়ে তারা রাস্তায় নামেনি।
২০২৪ সালের আগে বাংলাদেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ছিল ৪৯। তার মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্র দলগুলোও আছে। এদের নেতারা জুলাই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত মামলায় হয় কারাগারে, নয় আত্মগোপনে। স্বাভাবিকভাবেই কোনো ইস্যু নিয়ে নড়াচড়া করার সুযোগ এদের কারও নেই।
২০২৪-এর আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন করে ১৪টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয় নির্বাচন কমিশন, যাদের অনেকেই মূলত কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিত। এই ১৪টি দলের মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে ছয়টি আসনে জয়লাভ করে। এর বাইরে বিএনপির বদান্যতায় গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনও একটি করে আসন পায়। বাকি ১১টি দল কোনো আসন পায়নি। এমনকি এসব দলের প্রায় সব প্রার্থীর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়। গত ১৮ আগস্ট বাংলা ট্রিবিউন এ দলগুলোর ওপর একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সে অনুসারে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া এই দলগুলোর বেশির ভাগেরই খুব বেশি নেতাকর্মী নেই, যারা একটি কার্যালয় ভাড়া নিয়ে কয়েকটি চেয়ার-টেবিল পেতে এবং ব্যানার-সাইনবোর্ড টানিয়েই কোনোমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে এরা কথা বলবে, এমন প্রত্যাশা বাতুলতা।
নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে সিপিবি-বাসদসহ কয়েকটি বাম দল আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড. ইউনূস সরকার সম্পাদিত ‘দেশবিরোধী’ বাণিজ্য চুক্তিসহ কিছু বিষয় নিয়ে তারা কথা বলছে বটে, তবে সে আওয়াজ তেমন জোরালো নয়। তাদের শক্তি সীমিত, সন্দেহ নেই; তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শরিক এ দলগুলো বিশেষত সরকার প্রশ্নে এক প্রকার ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ দ্বন্দ্বেও ভুগছে বলে মনে হচ্ছে।
আমি নিশ্চিত, মানুষ চলমান সংকটগুলোর একটা বিহিত চায়। চায় গ্যাস-বিদ্যুতের হাহাকার থেকে মুক্তি। কিন্তু তা কীভাবে হবে, সেটি কেউ জানে না। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে কেউ মাঠে নামলেই অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ তকমা দিত। ওই বিপজ্জনক প্রবণতা বন্ধ হয়েছে, তা বলা যায় না।
তাহলে কি রাজনীতির মাঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের জায়গা শূন্যই থাকবে? তবে এমনটা তো আওয়ামী লীগও ভেবেছিল। এখনকার জামায়াতের মতো তাদেরও ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল ছিল। সেই বিরোধী দলকেও জনগণ প্রয়োজনের সময় মাঠে পেত না। তবে প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না; রাজনীতির ময়দানও বেশি দিন ফাঁকা থাকবে না। সরকার ইতোমধ্যে ছয় মাস পার করেছে। তার মধুচন্দ্রিমাও শেষ হয়েছে। তবে গণঅভ্যুত্থানের রেশ এখনও আছে বলে সরকার হয়তো
কখনও বিগত আওয়ামী সরকারকে, কখনও অন্তর্বর্তী সরকারকে দোষ দিয়ে নানা ইস্যুতে পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই এমনটা মনে হচ্ছে– গ্যাস নেই বিদ্যুৎ নেই; দেশে সক্রিয় কোনো রাজনৈতিক দলও নেই!
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.