সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনে চাঞ্চল্যকর শিরোনাম ভেসে ওঠার পর যাচাই ছাড়া তা ছড়িয়ে পড়া এখন প্রতিদিনের ঘটনা। কিন্তু তথ্যের এ অবাধ প্রবাহের আড়ালে অদৃশ্য এক জালিয়াতির জাল বিস্তার লাভ করেছে। একে কেবল কিছু বিভ্রান্ত মানুষের কাজ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বর্তমানে এটি একটি সুসংগঠিত শিল্প, প্রযুক্তিগত ফাঁদ এবং বিশাল অঙ্কের লাভজনক ব্যবসা। তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্য যাচাইকারীদের (ফ্যাক্ট-চেকারস) মতে, ভুয়া বা ভুল খবর মূলত তিন রূপ নিয়ে বাজারে আসে।
মিসইনফরমেশন বা ভুল তথ্য: তথ্যটি মিথ্যা, তবে এটি ছড়ানোর পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষতিকর উদ্দেশ্য থাকে না। এটি সাধারণত অসাবধানতাবশত ঘটে থাকে।
ডিসইনফরমেশন বা অপতথ্য: কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক শত্রুকে ঘায়েল করতে কিংবা আর্থিক ফায়দা লুটতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি ও প্রচারিত ভুয়া তথ্য।
মাল-ইনফরমেশন বা ক্ষতিকর তথ্য: এখানে মূল তথ্যটি সত্য হলেও এর প্রেক্ষাপট বিকৃত করে বা সময় বদলে দিয়ে কাউকে হেয় করার বা সংঘাত বাধানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়। ডিজিটাল দুনিয়ায় এ তিন ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে কাজ করছে প্রযুক্তির জটিল সমীকরণ, মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক মুনাফা।
টেকনোলজি ও আলগরিদমের ফাঁদ: সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো—যেমন ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউব—তাদের ব্যবহারকারীদের ধরে রাখার জন্য আলগরিদম ব্যবহার করে। এই আলগরিদমের মূল নীতি হলো এনগেজমেন্ট অর্থাৎ লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার বাড়ানো।
গবেষণায় দেখা গেছে, গঠনমূলক বা ইতিবাচক সংবাদের তুলনায় যেসব কনটেন্ট মানুষের মনে রাগ, ক্ষোভ, হিংসা বা বিস্ময় তৈরি করে, সেগুলো মানুষ বেশি শেয়ার করে। আলগরিদম এ মনস্তাত্ত্বিক সুযোগটিই নেয়। ব্যবহারকারী কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ভিডিও বা পোস্টে বেশি সময় দিলে আলগরিদম তাকে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখাতে থাকে। এর ফলে দুটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ইকো চেম্বার: ব্যবহারকারী কেবল নিজের পছন্দের মতাদর্শের খবরই দেখতে পান এবং ভিন্নমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে ভুয়া খবর হলেও নিজের মতের সঙ্গে মিললে তিনি সেটিকে পরম সত্য মনে করেন।
ফিল্টার বাবল: আলগরিদম ব্যবহারকারীর চারপাশে একটি কৃত্রিম তথ্যের দেয়াল তুলে দেয়, যেখানে সত্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। প্রযুক্তি সংস্থাগুলো নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এ ক্ষতিকর এনগেজমেন্টকে প্রমোট করে, যার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ পাঠককে।
এআই ও ডিপফেক: প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া খবর তৈরির কৌশলেও এসেছে বিপ্লব। আগে যেখানে এডিটিং সফটওয়্যার দিয়ে সাধারণ ছবি বিকৃত করা হতো, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
ভয়েস ক্লোনিং: এআই ব্যবহার করে এখন যে কোনো রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি বা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করা সম্ভব। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও স্যাম্পল ব্যবহার করেই বানিয়ে ফেলা যায় কোনো অপরাধমূলক স্বীকারোক্তি বা উসকানিমূলক বক্তব্য।
ডিপফেক ভিডিও: একইভাবে, ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো মানুষের চেহারা অন্য কারও শরীরে বসিয়ে এমন ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা দেখে আসল-নকল পার্থক্য করা অসম্ভব।
ফটোকার্ড টেম্পারিং: বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সংবাদপত্রের নকল ফটোকার্ড দিয়ে। মূলধারার প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের ফন্ট, লোগো ও বিন্যাস হুবহু ব্যবহার করে মিথ্যা ব্রেকিং নিউজ বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ ছবির ওপর পত্রিকার লোগো দেখেই সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে বসেন।
ক্লিকবেট ইকোনমি: অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে শুধু মেধা বা প্রযুক্তি নয়, কাজ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ভুয়া খবর ছড়ানো এখন বিশ্বজুড়ে এক লাভজনক অনলাইন শিল্পে পরিণত হয়েছে।
ভিউ ব্যবসা ও অ্যাডসেন্স সিন্ডিকেট: অনেক অসাধু কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ওয়েবসাইট মালিক চটকদার ও ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করে পাঠকদের নিজেদের সাইটে নিয়ে আসে। সাইটে যত বেশি ট্রাফিক আসবে, গুগল অ্যাডসেন্স বা অন্যান্য বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক থেকে তাদের আয় তত বাড়বে। এটিকে বলা হয় ক্লিকবেট ইকোনমি।
পেইড পেজ ও বট ফার্ম: একটি ভুয়া খবর নিমেষেই ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করে বট ফার্ম। হাজার হাজার কৃত্রিম বা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে আলগরিদমকে বিভ্রান্ত করা হয়, যাতে পোস্টটি ট্রেন্ডিংয়ে চলে আসে। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা বা ভুয়া খবর ভাইরাল করার জন্য সুসংগঠিত ট্রোল আর্মি ও পেজ সিন্ডিকেট ভাড়া পাওয়া যায়।
ভার্চুয়াল গুজব থেকে বাস্তব সহিংসতা: সামাজিক অস্থিতিশীলতা: ডিজিটাল দুনিয়ার একটি ভুয়া স্ট্যাটাস কীভাবে বাস্তব জীবনের রক্তপাতে রূপ নিতে পারে, তার অনেক মর্মান্তিক উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় অবমাননা, শিশু অপহরণ বা অপরাধের ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে স্থানীয় জনগণকে খেপিয়ে তোলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এর পরিণতিতে ঘটে চলেছে মব জাস্টিস, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত। ভুয়া গুজবের ওপর ভর করে উত্তেজিত জনতা আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। মুহূর্তের একটি ভুয়া পোস্ট বহু পরিবারকে ধ্বংস করে দেয় এবং পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
মূলধারার মিডিয়ার তাড়াহুড়ো ও আস্থার সংকট: অপতথ্য ছড়ানোর দায় কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই; এর পেছনে মূলধারার গণমাধ্যমের শিথিলতাও কম দায়ী নয়।
আজকাল ব্রেকিং নিউজের ইঁদুর দৌড়ে জিততে গিয়ে অনেক মূলধারা ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে তথ্য নিয়ে সোর্স ভেরিফিকেশন ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করে ফেলে। যখন একটি ভুয়া খবর মূলধারার টিভি বা পত্রিকায় চলে আসে, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে শতভাগ প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পেয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সংবাদটি প্রত্যাহার বা ভুল স্বীকার করা হলেও জনমনে যে ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে যায়।
এভাবে বারবার ভুল ও যাচাইহীন সংবাদ প্রকাশের ফলে গণমাধ্যমের ওপর থেকে মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা উঠে যাচ্ছে। আর প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়ার এই শূন্যস্থানটিই দখল করে নিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ও ভুয়া পেজগুলো।
ডিজিটাল লিটারেসি ও প্রতিরোধ: অপতথ্যের এ বহুমাত্রিক আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ। নাগরিকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে হবে। যে কোনো খবর পড়ার পর শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তথ্য যাচাইকারী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলো আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত ভুয়া খবর শনাক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া টেক প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের আলগরিদম সংশোধন করতে বাধ্য করতে হবে এবং অপরাধমূলক অপপ্রচারের সঙ্গে জড়িত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কগুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের যোগাযোগের পথ সহজ করেছে, কিন্তু তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। একটি শেয়ার বাটনে ক্লিকের আগে ৩ সেকেন্ডের ইতস্তত ভাব হয়তো একটি জীবন, একটি সমাজ বা একটি দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.