কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সর্বসাম্প্রতিক খবর হলো, ‘এআই এজেন্ট’ নিজে থেকে গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত ও সংরক্ষিত পরিবেশের নিরাপত্তা বেড়াজাল ভেদ করে বেরিয়ে গিয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছিল। এটা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চললেও আক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ‘হাগিং ফেস’ ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীকে জানানোর আগ পর্যন্ত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেন এআই’ ধরতে পারেনি, তাদের ‘বেয়াড়া এজেন্ট’ কী করেছে (রয়টার্স, ২৫ জুলাই ২০২৬)।
এটা কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা দু’ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ মনে করে, এটা অনিচ্ছাকৃত, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিনিধি নিজে থেকে এটা করেছে। কেউ কেউ আবার মনে করে, আসন্ন পুঁজিবাজারে প্রবেশের সময় শেয়ারের দাম ও চাহিদা বাড়ানোর জন্য নিজেদের প্রযুক্তিকে অগ্রসর প্রমাণ করতে ওপেন এআই এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করে থাকতে পারে। সত্যিটা যা-ই হোক; কোনোটাই আমজনতার জন্য কম বিপজ্জনক নয়। যেমনটা নয় এ বিষয়ে আপাত-উদাসীনতা।
এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, জিপিটি ৫.৬ সল ও অন্য একটি আরও অগ্রসর পরীক্ষামূলক সংস্করণ তাদের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা পরীক্ষা করার সময় নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হয় এবং হাগিং ফেস সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে। বিভিন্ন প্রোগ্রামের আগে থেকে অজানা দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেগুলোর মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে এবং সেখান থেকে নতুন আরেকটি প্রোগ্রামকে আক্রমণ করে। এভাবে প্রায় ১৭ হাজার আক্রমণের ঘটনা ঘটায়।
বিষয়টি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের নাড়া দিয়েছে। তারা ইতোমধ্যে একটি আইনের প্রস্তাব করেছে যাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয় তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ‘কিল সুইচ’ রাখতে, যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক মন্থর বা বন্ধ করে দেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, যদি বুঝতে দেরি হয়?
যদিও ওপেন এআই একে ‘অভূতপূর্ব ঘটনা’ বলছে; ওই সপ্তাহের শুরুর দিকেই তাদের আরেকটি আরও শক্তিশালী পরীক্ষামূলক সংস্করণ নিরাপত্তা বেড়াজাল ভেঙে ফেলেছিল। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর সবচেয়ে অগ্রসর সংস্করণ ‘ক্লদ মিথোস’ এপ্রিল মাসের শুরুতে একটি পরীক্ষার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে ইমেইল শুধু করেনি; তা গোপন করতে প্রমাণ মুছে ফেলারও চেষ্টা করে।
যুক্তরাজ্যের সরকার সংশ্লিষ্ট এআই সংস্করণগুলোর ঝুঁকি নির্ণয় সংস্থা এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট জানায়, মূল্যায়নের সময় আরেকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিনিধি তাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিল। তারা আরও জানায়, যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্প্রতিক সংস্করণগুলো মূল্যায়নের সময় প্রতারণার চেষ্টা করে নিয়ম ভেঙে সহজে কাজ সমাপনের চেষ্টা করে, নিষেধ সত্ত্বেও ইন্টারনেটে প্রশ্নের উত্তর খোঁজে; নেটওয়ার্কের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে চায়; মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও অননুমোদিত ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করতে এবং তা গোপন করারও চেষ্টা করে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আকস্মিক নয়, বরং অগ্রসর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিনিধিগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা এদের মৌলিক গঠনশৈলীতেই নিহিত।
সমস্যা হচ্ছে, সমসাময়িক মানুষের জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। বর্তমানে আর্থিক, বাণিজ্যিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ প্রায় সব নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা, এমনকি বিনোদন, সবই নির্ভরশীল তথ্যপ্রযুক্তির ওপর। ইন্টারনেটের ব্যবহারও প্রায় অপরিহার্য, আর সব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় যদি কোনো কারণে এগুলো ঠিকমতো কাজ না করে তাহলে শুধু সেবাই ব্যাহত হবে না, বিপর্যয়ের কারণও হতে পারে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ, যুক্তরাজ্যের ডাক বিভাগে ফুজিৎসু কোম্পানির হরাইজন সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাবে গরমিল হতো। এর ফলে ৯ শতাধিক সাব-পোস্টমাস্টার মামলার শিকার হন; দুই শতাধিক জেল খাটেন; ১৩ জন আত্মহত্যা করে আর বহু মানুষ দেউলিয়া হয়। মামলা ও বদনাম অনেক জীবন তছনছ করে দেয়। যদি একটি প্রতিষ্ঠানের খুবই সাধারণ সফটওয়্যারের ত্রুটি এমন মারাত্মক পরিণাম ডেকে আনতে পারে, তবে স্বনির্ভর-স্বয়ংক্রিয়, অতি শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিনিধি কী ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে, অনুমান করাও কঠিন।
আরেকটি ঝুঁকি হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ক্রমবর্ধমান হারে সামরিক ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক সমরাস্ত্র, আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সমন্বিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে। সেবা ও সামরিক ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি নয়, বরং পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তির বিগত উদ্ভাবনগুলোর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও যে আশার কথা বলা হচ্ছে; সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে বলে যে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তার বদলে ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ বেড়ে যাওয়া; অল্প কিছু ধনী মানুষের লাভবান হওয়া, বাকি জনসংখ্যার ওপর তাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিই বেশি। অন্যদিকে, এই অতি শক্তিশালী ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ থাকবে হাতেগোনা কিছু ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের কাছে। কিন্তু এর প্রভাব থাকবে বিশ্বজোড়া। ফলে ওই রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা অভূতপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠবে, যা নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ, সাম্রাজ্যবাদ, কর্তৃত্ববাদের জন্ম দিতে পারে। বিশেষত কম ক্ষমতাবান ‘বৈশ্বিক দক্ষিণের’ দেশগুলো বর্ধিত ঝুঁকির মুখে পড়বে। যার নমুনা আমরা এখনই দেখতে পাচ্ছি, যখন ইলন মাস্কের মতো বর্ণবাদী ধনকুবেররা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাদী ডানপন্থিদের পক্ষে নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে।
আমাদের মতো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল দেশগুলো এ অবস্থায় বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে– প্রথমত, আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে সক্ষমতা ও সচেতনতা খুব কম; দ্বিতীয়ত, আমাদের এর প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার কোনো উপায় নেই; নেই ন্যূনতম সুরক্ষা ব্যবস্থাও; তৃতীয়ত, এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মতো অর্থেরও অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের ঘাটতির জন্য আমার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সহজে আইনগতভাবে দায়ী বা নীতি পরিবর্তনে বাধ্যও করতে পারি না বা ভবিষ্যতেও পারব না।
এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কিছু না করে অন্যদের দয়ার ওপর ভরসা করে বসে থাকার উপায় নেই। নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে। আর সেটা করার জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা হলো নিজেদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ও প্রাযুক্তিক সক্ষমতা অর্জন। তার জন্য চাই শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ, উপযুক্ত অবকাঠামো, মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং বিচক্ষণ নীতি নির্ধারণ। সেটা সহজ বা তাৎক্ষণিক করে ফেলার মতো কোনো বিষয় নয়। তার জন্য লাগবে প্রস্তুতি ও সময়।
ইতোমধ্যে অন্যেরা বসে থাকবে না। আমরা এখন পেছনে পড়ে আছি, যদি অবিলম্বে সামনের সারিতে যাওয়ার যাত্রা শুরু না করি তবে সব সময় পেছনেই পড়ে থাকতে হবে, আর তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
আবু আলা মাহমুদুল হাসান: গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.