টেস্ট ক্রিকেট ধৈর্যের মহাকাব্য। পাঁচদিনের দীর্ঘ অভিযানে প্রতিটি সেশন একেকটি অধ্যায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য ম্যাকাই টেস্ট হয়ে থাকল দুঃস্বপ্নের এক ক্ষুদ্র উপন্যাস। ম্যাচের শুরুতেই ব্যাটিং বিপর্যয়, মাঝপথে শরীফুল ইসলামের বীরত্ব, শেষ অধ্যায়ে আবার মিচেল স্টার্কের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বাংলাদেশের প্রতিরোধ। মাত্র দু’দিনেই শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। রোববার ম্যাকাইয়ে ইনিংস ও ৫১ রানে বাংলাদেশকে হারিয়ে ডারউইনের ঐতিহাসিক হারের জবাব দিল স্বাগতিকরা। দুই ম্যাচের সিরিজ শেষ হলো ১-১ সমতায়। তবে শেষ ম্যাচে হারলেও নিজেদের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশ প্রথমবার আইসিসি টেস্ট র্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে উঠে এসেছে।
এক সপ্তাহ আগেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জিতে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাকাইয়ে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নেমেছিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নাম লেখা হলো বিব্রতকর এক ইতিহাসে। টেস্ট ক্রিকেটে ২৬ বছরের পথচলায় প্রথমবার কোনো ম্যাচের দুই ইনিংসেই ১০০ রানের নিচে অলআউট হলো বাংলাদেশ। মাত্র ৭৫০ বলে শেষ হওয়া ম্যাচটি টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ সংক্ষিপ্ততম এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিতীয় সংক্ষিপ্ততম টেস্ট। ১৯৩২ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর চেয়ে কম বলে টেস্ট শেষ হয়েছিল। ১৮৮২ সালে প্রথমবার দু’দিনে টেস্ট শেষ হওয়ার পর ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ম্যাচের সংখ্যা খুব বেশি নয়।
বাংলাদেশের ৬৪ জবাবে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থেমেছিল ২১০ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে প্রতিরোধের ক্ষীণ আশাও শেষ হয়ে যায় ৯৫ রানে অলআউট হয়ে। দুই ইনিংস মিলিয়েও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের কাছাকাছি যেতে পারেনি বাংলাদেশ। ম্যাচের নায়ক মিচেল স্টার্ক। প্রথম ইনিংসে ১২ রানে ছয় উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া বাঁ-হাতি পেসার দ্বিতীয় ইনিংসে নেন আরও চারটি। ম্যাচে তার শিকার ৫১ রানে ১০ উইকেট। টেস্টে চতুর্থবার এক ম্যাচে ১০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে। সিরিজসেরার মুকুটও গেছে স্টার্কের মাথায়। প্রথমদিন স্টার্কের গতি, প্যাট কামিন্সের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং হয়ে উঠেছিল ভঙ্গুর এক দুর্গ। ৬৪ রানে অলআউট হয়ে শুরুতেই তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয় অস্ট্রেলিয়ার হাতে। তবে বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। এক প্রান্তে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের চাপে রাখেন শরীফুল ইসলাম। তার দুর্দান্ত সুইং, সিম মুভমেন্ট ও আগ্রাসী লাইন-লেন্থে স্বাগতিকদের ব্যাটিংও একসময় দুলে উঠেছিল। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে সাত উইকেট নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের আশার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার লেজের ব্যাটাররা সেই আলোকে ম্লান করে দেন। দ্বিতীয় দিনে আট উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করে স্বাগতিকরা শেষ পর্যন্ত ২১০-এ থামে। ক্যামেরন গ্রিন ৬২ রান ও নাথান লায়ন করেন ৩২* রান। অস্ট্রেলিয়া পায় ১৪৬ রানের লিড। দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের শুরুটা হয় পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তিতে। স্টার্কের বল বারবার ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলছিল। সাদমান ইসলাম পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন, পরের বলেই মুমিনুল হককে বোল্ড করে স্টার্ক বুঝিয়ে দেন, দিনের ম্যাচের প্রধান চরিত্র তিনিই। তানজিদ হাসানও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। কামিন্সের বলে হুক করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন তিনি।
অন্যপ্রান্তে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছিলেন। স্টার্ককে একাধিকবার বাউন্ডারি মেরে ম্যাচের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ৩১ রানে তার বিদায়ের পর আবারও নামে ধস। লিটন দাসের জন্য সিরিজটি হয়ে রইল দুঃস্বপ্নের। তিন ইনিংসেই কোনো রান করতে পারেননি তিনি। তাইজুল ইসলামকে ফিরিয়ে স্টার্ক পূর্ণ করেন ম্যাচের ১০ উইকেট। এরপর লায়নের ঘূর্ণিতে তাসকিন ও শরীফুল বিদায় নিলে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। মুশফিকুর অপরাজিত থাকেন ২৯ রানে। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে নয় উইকেটে হারিয়ে যে দল এক সপ্তাহ আগে ইতিহাসের দরজা খুলেছিল, ম্যাকাইয়ে সেই দলই দাঁড়াল ইতিহাসের অন্যপ্রান্তে। তবে সিরিজ ড্র হওয়ায় এক লাফে তিন ধাপ এগিয়ে টেস্ট র্যাংকিংয়ে নিজেদের সর্বকালের সেরা অবস্থান ছয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এটাও অনেক বড় প্রাপ্তি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.