চট্টগ্রামে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির বিরুদ্ধে সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত কোনো ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াই ২৭টি ডিলের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উত্তোলন করা হয়। পরে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। গতকাল মঙ্গলবার দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মোকাররম হোসাইন কালবেলাকে এ তথ্য জানান।
তিন ঘটনায় ২৭ ডিল: নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২০ মার্চ ইসলামী ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখার গ্রাহক আরামিট সিমেন্টের আবেদনের পর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদনের কথা বলা হয়।
একই বছরের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখার গ্রাহক আরামিট সিমেন্টের আবেদনে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কামাল বাজার শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ১৭টি ডিলের মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত সময়ে একই জুবিলী রোড শাখার গ্রাহক আরামিট সিমেন্টের আবেদনে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সদরঘাট শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ৯টি ডিলের তথ্য উল্লেখ করা হয়। নথিতে গ্রাহকের ইকুইটি ৪ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাদ দিয়ে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদনের কথা বলা হয়। অর্থাৎ তিন ঘটনায় ডিলের সংখ্যা ২৭টি।
দুদকের নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, অনুমোদিত ঋণের অর্থ বেআইনিভাবে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে আরামিট গ্রুপের কর্মচারীদের মালিক সাজিয়ে ভুয়া সরবরাহকারী তৈরি করা হয়। পরে ডিল অনুমোদন করিয়ে অর্থ বিভিন্ন হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ নগদে উত্তোলন, আগের দায় পরিশোধ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাচার করা হয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, ইউএইতে পাচার করা অর্থ দিয়ে সেখানে সম্পদ কেনা হয়। একইভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ কেনার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অর্থের উৎস ও গতিপথ অনুসরণ বা ‘ফলো দ্য মানি’ না করে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরে সহযোগিতার অভিযোগও বিভিন্ন আসামির দায়িত্বের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার নথির তালিকায় প্রথম আসামি হিসেবে রয়েছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী। আরামিট গ্রুপের মালিক ও তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার প্রভাবে ইউসিবি পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য না হয়েও পর্ষদ সভায় অংশ নেওয়া ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নথিতে তাকে ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ ও অন্যতম হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদন, আরামিট গ্রুপের কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে ভুয়া সরবরাহকারী দেখানো এবং ডিল অনুমোদন করানোর অভিযোগ রয়েছে। পরে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে নগদে উত্তোলন, আগের দায় পরিশোধ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
দ্বিতীয় আসামি রুকমিলা জামান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইউসিবি পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান। নথিতে তাকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী এবং ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ ও অন্যতম হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ইউএইতে পাচার করা অর্থ দিয়ে সেখানে সম্পদ কেনা এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ কেনার অভিযোগও রয়েছে।
তৃতীয় আসামি মোহাম্মদ শাহ আলম আরামিট সিমেন্টের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ও ইউসিবির সাবেক পরিচালক। তার বিরুদ্ধে ভুয়া আবেদনের মাধ্যমে ডিল অনুমোদন করানো এবং অর্থ উত্তোলন ও পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
চতুর্থ আসামি মো. আব্দুল আজিজ ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী এবং আরামিটের এজিএম। আরামিট গ্রুপের কর্মচারী হয়েও তাকে মালপত্র সরবরাহকারী হিসেবে দেখিয়ে ভুয়া ডিল অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। নথিতে তাকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পিএস এবং তার সম্পদের রক্ষক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চম আসামি এ কে এম মারুফ আরামিট সিমেন্টের এজিএম। মালপত্র সরবরাহ না হলেও ভুয়া আবেদন করে ডিল অনুমোদন করানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া মামলার তালিকায় ইসলামী ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখার একাধিক কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. জাকির হোসেন, রিলেশনশিপ অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল হক, প্রিন্সিপাল অফিসার ও জেনারেল ব্যাংকিং ইনচার্জ মুহাম্মদ তানভীর হাসান, ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনচার্জ ও প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আবদুল কাদের, ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জ ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, ম্যানেজার অপারেশন ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মুহাম্মদ আবদুল করিম, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আখতার হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার (বিনিয়োগ) মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন, জুনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, এফএভিপি ও ম্যানেজার অপারেশন মো. আশরাফ উদ্দীন, প্রিন্সিপাল অফিসার ও ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনচার্জ মোহাম্মদ রাশেদ সাদাত, প্রিন্সিপাল অফিসার, ইনভেস্টমেন্ট আকতারুল আজীম, সিনিয়র অফিসার মো. মহিউদ্দীন, প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম, সিনিয়র অফিসার ও জেনারেল ব্যাংকিং ইনচার্জ মো. শহিদুল্লাহ, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জ মোহাম্মদ হারুন আল রশিদ, সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ মহসীন আলী, এসভিপি ও ম্যানেজার অপারেশন আবুল কালাম আজাদ, এসভিপি ও শাখা ব্যবস্থাপক এবং শেখ মনিরুজ্জামান, এফএভিপি ও ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনচার্জ। এসব ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিলের বিপরীতে কোনো মালপত্র সরবরাহ না হলেও অফিস নোট, পে-অর্ডার ইস্যু ও ইন্সট্রাকশন প্রদানসহ বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করে পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগ করা হয়।
মামলার তালিকায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কামাল বাজার শাখার মো. রুবেল উদ্দীন, জুনিয়র অফিসার কে এ এম ইয়াসির হেলালী, এভিপি ও ম্যানেজার অপারেশন এবং ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী, এভিপি ও শাখা ব্যবস্থাপকের নাম রয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আব্দুল আজিজ আরামিট গ্রুপের এজিএম এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পিএস হওয়া সত্ত্বেও তাকে সরবরাহকারী দেখিয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল ও ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ফলো দ্য মানি না করে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ ও ইউএইতে পাচারে সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার মো. এমদাদুল হাসান, এসএভিপি এবং খোরশেদ আলম, ম্যানেজার ও শাখা ব্যবস্থাপকের নামও তালিকায় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিককে সরবরাহকারী দেখিয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল ও ব্যাংক হিসাব খোলা এবং অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ ও ইউএইতে পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.