থানা, আদালত চত্বর কিংবা পুলিশি নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে একের পর এক আসামি পালানোর ঘটনা কোনোভাবেই থামছে না। সবশেষ বৃহস্পতিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে থাকা নারী আসামি মিতু আক্তার পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মাঝে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। মিতু ছাড়াও এ বছর আরও ৭ জন দুর্ধর্ষ আসামি পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যায়।
শুধু এবারই নয়, এর আগেও দফায় দফায় পুলিশের কাছ থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বিভাগ থেকে এসব ঘটনা চেপে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। যে কারণে পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়েও মেলেনি। পরে যুগান্তরের তরফ থেকে খোঁজখবর নিয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, বিগত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলায়নের ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালে।
ওই বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১২ জন আসামি পালায়। এর আগে ২০২৪ সালে ৫ জন, ও ২০২৩ সালে ৪ জন আসামি পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় পলায়ন করে। যদিও এভাবে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের কাউকে কাউকে পরে গ্রেফতার করা হলেও পুলিশ এর প্রকৃত সংখ্যা জানাতে পারেনি।
কেন এবং কীভাবে পুলিশের নিরাপত্তা জাল ছিন্ন আসামি পালাচ্ছে-তার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করেছে যুগান্তর। এতে দেখা যায়, আদালতে হাজিরার জন্য জেল থেকে আনা আসামি হস্তান্তর ও প্রিজনভ্যানে তোলার সময় নিরাপত্তার চরম ফাঁকফোকর থাকে। এ সুযোগটা নেয় আসামিরা। এছাড়া আসামিদের চোখে চোখে রাখতে পর্যাপ্ত সদস্য না থাকা, হাতকড়া ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে ত্রুটি, ভিড়ের মধ্যে আসামি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং দায়িত্বে থাকা সদস্যদের অসতর্কতার কারণে নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে আসামি পালাতে সক্ষম হয়। তথ্যানুসন্ধানে আরও একটা কারণ সামনে এসেছে তা হলো-পালিয়ে যাওয়া আসামির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ। এছাড়াও আসামি আনা-নেওয়ায় থানা পুলিশ, আদালত পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেও ঘটছে এমন ঘটনা।
হাতকড়া খুলে কিংবা প্রিজনভ্যানে তোলার মুহূর্তে আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়। তবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে রোধ করা যাচ্ছে না। অনেকে বলছেন, সর্ষের ভিতর ভূত। তাই নিরাপত্তা হেফাহত থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।
এদিকে আসামি পালানোর ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, হেফাজতে থাকা একজন আসামির পলায়ন শুধু সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করে না; এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে হত্যা, ডাকাতি ও মাদকসহ গুরুতর মামলার আসামিরা পালিয়ে গেলে সাক্ষী ও বাদীর নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই শুধু দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সদস্যকে প্রত্যাহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রতিটি ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা প্রটোকল নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, হেফাজত থেকে আসামি পলায়নের পেছনে দুটি মূল বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, আসামিকে নিরাপদ হেফাজতে রাখার জন্য যে ধরনের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজন, সেখানে ঘাটতি থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আসামির কোনো ধরনের যোগসাজশ বা আঁতাত থাকা।
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, পলায়নের ঘটনা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে গুরুতর ও পেশাদার অপরাধীদের বা যে কোনো শক্তিশালী আসামিকে হেফাজতে রাখা পুলিশের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে পুলিশের উচিত অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তিনি আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টিও সংযোজন করেন। বলেন, যখন কোনো সাক্ষী জানবে আসামি পালিয়েছে, সেই আসামি পরে আরও শক্তি সঞ্চয় করে সাক্ষীর জন্য বড় ধরনের হুমকির কারণ হতে পারে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, হেফাজত থেকে আসামি পলায়নের প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে নিরাপত্তা ঘাটতি ও দায়িত্বে অবহেলার কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে। হেফাজত নিরাপত্তা জোরদার, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আল আমিন সরকার
মোবাইল: +8801676791162
অফিস : 378/6, East Goran, Khilgaon, Dhaka-1219.
ইমেইল : sbservicesltd2025@gmail.com
Design & Development By HosterCube Ltd.