
নুসরাত জাহান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
দিনটি ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮), রোজ বৃহস্পতিবার।
কেবল ভোরের আলো ফুটেছে। চারদিকে বসন্তের দক্ষিণা হাওয়া—শীতল, মিষ্টি সুগন্ধে ভরা। সূর্যের সোনালি কিরণে পথঘাট যেন অদ্ভুত এক রঙে মেতে উঠেছে। দূরের মাঠে কচি ঘাসগুলো মনে হয় সদ্যই শিশিরে গা ভিজিয়ে নিয়েছে।
বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রৌদ্রের তীব্রতা বাড়তে শুরু করল। বাতাসে সেই মিষ্টি গন্ধ আর নেই। নিস্তব্ধতায় মোড়া সকাল গড়িয়ে দিনভর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল চিৎকার, আর্তনাদ আর হাহাকার। পাষাণ যন্ত্রটির মহাহুংকারে কেঁপে উঠল রাজপথ। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল তাজা রক্তের গন্ধ—এ দেশের সোনার ছেলেদের রক্ত, আত্মত্যাগের রক্ত, অধিকার আদায়ের রক্ত। আপামর মানুষের প্রাণের সংগ্রামে রাজপথ রক্তিম হয়ে উঠল।
এ ছিল মাতৃভাষা বাংলাকে তার স্বমর্যাদা দানের লড়াই, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। শত শত তরুণের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলা—মায়ের ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা।
আজ কবির ভাষায় আমাদের আর বলতে হয় না—
“মাগো, ওঁরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে,
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো মা, তাই কি হয়?”
ভাষা—একটি জাতির মনোভাব প্রকাশের প্রতীক। ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি পরিচয়ের ভিত্তি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এই ভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষায়, বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দানের সংগ্রামে অনেকে জীবন দিয়ে গেছেন। এই চেতনা হঠাৎ জন্ম নেয়নি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই হায়েনার মতো শাসকগোষ্ঠী আমাদের মায়ের ভাষার ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। তৎকালীন পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার কার্জন হল-এ এক সমাবেশে ঘোষণা করেন—
“Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan.”
এই ঘোষণার পর থেকেই পূর্ববঙ্গের তরুণ সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ধীরে ধীরে এই প্রতিবাদ রূপ নেয় এক তীব্র গণআন্দোলনে।
আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ছাত্রসমাজের হাত ধরেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৪৮ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সভা, মিছিল ও ধর্মঘট শুরু হয়। গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী জনগণের এই ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। যা ধীরে ধীরে ৫২ এর আন্দোলনের পথকে প্রসস্থ করে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেমে থাকেনি। ছাত্ররা নিষেধাজ্ঞা ভেঙে রাজপথে নামে। শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালালে ঝরে যায় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক তরুণের তাজা প্রাণ। রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। ইতিহাসে লেখা হয়—ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার এক অনন্য অধ্যায়। গুলির শব্দ থেমে গেলে রাজপথ জুড়ে নেমে আসে এক ভয়ংকর নীরবতা। বারুদের গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, সে নীরবতায় ছিল শত শত মায়ের কান্না, বন্ধুর আহাজারি, আর স্বপ্নভাঙা এক প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাস। রক্তে লেখা হলো এমন এক ইতিহাস, যা কোনো শাসকের বন্দুক মুছে দিতে পারেনি।
যে তরুণরা সেদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল, তারা শুধু প্রাণ দেয়নি—তারা ভাষাকে দিয়েছে অমরত্ব। সেদিন রাজপথে ঝরে পড়া প্রতিটি রক্তবিন্দু বলে দিয়েছিল,
ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়—ভাষা সম্মান, ভাষা অস্তিত্ব, ভাষা আত্মপরিচয়, প্রতিটি বাঙালির পরিচয়ের প্রতীক। বাংলা সেদিন কেঁদেছিল, আবার সেদিনই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল শহিদের রক্তাক্ত হাত ধরে।
এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। প্রবল গণচাপের মুখে ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ভিত গড়ে দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
সেই রক্তাক্ত রাজপথ থেকে আজকের ২১ ফেব্রুয়ারি।
ফেব্রুয়ারির বাতাসে আজও কি ভেসে আসে রক্তমাখা উচ্চারণ— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’?
নাকি ২১ ফেব্রুয়ারি এখন শুধুই ফুল দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় আটকে গেছে?
কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে এই ভাষার বিবর্তন ঘটে। বর্তমানে আমরা যেই বাংলা ভাষায় কথা বলি, এই বাংলা ভাষা একসময় ছিলো আরো গুরুগম্ভীর, মাধুর্যময়, সংযত, দায়িত্বশীল। শব্দে শব্দে ছিল শালীনতা, বাক্যে বাক্যে ছিল ভাবের গভীরতা। সময়ের সঙ্গে ভাষা বদলানো স্বাভাবিক—কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই পরিবর্তন কি সবসময় উন্নতি এনেছে?
আজকের বাংলায় আমরা শব্দ সংক্ষেপ করি, বিকৃত করি, কখনো অবহেলায়, কখনো তথাকথিত আধুনিকতার নামে। ভাব প্রকাশ সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে ভাষার সৌন্দর্য, শুদ্ধতা আর আত্মমর্যাদা। যে ভাষার জন্য একদিন তরুণরা বুক পেতে দিয়েছিল পাকসেনাদের গুলির সামনে, সেই ভাষাকেই কি আমরা আজ নিজেরাই হালকা করে ফেলছি না?
ভাষার বিবর্তন অনিবার্য, কিন্তু অবমূল্যায়ন নয়। সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো—এই অবহেলা আরোপিত নয়, স্বেচ্ছায়।
আমরাই লজ্জা পাই শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে। আমরাই ভুল উচ্চারণকে স্বাভাবিক করে তুলি। আমরাই ভুলে যাই—এই ভাষার প্রতিটি অক্ষরের পেছনে রক্তের ইতিহাস আছে।
ভাষা বাঁচে যত্নে, চর্চায়, ভালোবাসায়।
এখনকার ২১শে ফেব্রুয়ারি কেবল পুষ্প অর্পণ, প্রভাত ফেরির মিছিলেই সীমাবদ্ধ, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে মায়ের ভাষার করুন ইতিহাস। কেবল একদিন ফুল দিয়ে নয়—প্রতিদিনের কথায়, লেখায়, চিন্তায় বাংলাকে ধারণ করলেই শহীদদের রক্তের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে।
• শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করা শুধু নিয়ম মানা নয়, এটি আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মানের বহিঃপ্রকাশ।
• ভাষার বিকৃতি আধুনিকতা নয়—এটি অবহেলা; আর অবহেলা থেকেই ভাষার মৃত্যু শুরু হয়।
• নতুন প্রজন্ম কেবল বই নয়, মানুষ দেখে শেখে—আমাদের কথাবার্তাই তাদের প্রথম ভাষাশিক্ষা।
• একুশ মানে বছরে একটিদিন নয়; একুশ মানে প্রতিদিনের ভাষাচর্চা।
• ভুলকে স্বাভাবিক না করে সংশোধনকে সংস্কৃতি বানাতে হবে।
• বাংলাকে ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়—শুদ্ধ উচ্চারণ, সচেতন লেখা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার।
• যে ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছে, সেই ভাষার প্রতি উদাসীনতা সবচেয়ে বড় অবমাননা।
একুশ আমাদের কেবল অতীতের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় না, আমাদের বর্তমানের দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয়। যে ভাষার জন্য একদিন রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষা আজ আর রাজপথের সংগ্রাম নয়—এটি আমাদের দৈনন্দিন আচরণ, কথাবার্তা ও লেখালেখির দায়িত্ব।
মায়ের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা মানে শুধু একটি দিনে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নয়; বরং প্রতিদিন শুদ্ধভাবে বলা, সচেতনভাবে লেখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষার ইতিহাস ও গুরুত্ব তুলে ধরা। ভাষার বিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু অবহেলা নয়—এই সত্যটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।
একুশ তখনই সার্থক হবে, যখন বাংলা থাকবে আমাদের চিন্তা, চেতনায়, প্রতিবাদ, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের ভাষা হিসেবে। ভাষার প্রতি এই দায়বদ্ধতাই হতে পারে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের প্রকৃত সম্মান। মায়ের ভাষাই হোক আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের আশ্রয়; ভাষা শহীদরা বেঁচে থাকুন প্রতিটি হৃদয়ে।