
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে একটি মিশ্র চিত্র রয়েছে। তবে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রবণতা বেশি। রাজস্ব আদায়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এসব কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–সিপিডি গতকাল সোমবার এক মিডিয়া সংলাপে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপ-সংক্রান্ত ৯টি খাতের ৩৬২ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সিপিডির মূল্যায়নে স্বস্তি ও অস্বস্তির দিকগুলো তুলে ধরা হয়। খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে–সুশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা।
‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপ রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিপিডির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ সংস্থার গবেষকরা সংলাপে অংশ নেন।
মূল উপস্থাপনায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। গত ছয় মাসের মূল্যায়নে এ দুই ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং দুই ক্ষেত্রেই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, টাকা সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে এসব মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্বেগের জায়গা হিসেবে ৯৫ কারখানা স্থায়ী বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক বেকার হয়েছে।
সুশাসন ও জনপ্রশাসন প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরকারি সংস্থার উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া। সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আদালত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ মেধা, নিরপেক্ষতা এবং এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা সুরক্ষা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট ও ‘মব কালচার’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও মব সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই সরকার টিকে থাকার কোনো বিকল্প নেই। সরকার সফল না হলে নানান বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে পুরোনো সরকারের রাজনৈতিক পদাঙ্ক অনুসরণ করলে সরকার নিজেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা মানবাধিকার, গুম কমিশন, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন যদি সরকার রক্ষা করতে না পারে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় বলেন, গেল ছয় মাসে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয়। প্রধানমন্ত্রী এই জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে আমলাদের নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কিনা সেটি নেতৃত্বের ক্ষমতা ও যোগ্যতার বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের মানের প্রশ্নে গ্রেড দেওয়া সংক্রান্ত অন্য প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, ‘এ’ দিতে চাই, তবে টানে ‘বি’ এর দিকে। তবে ‘বি’ ধরে রাখার জন্য সক্ষমতা ও সংস্কার দেখতে পারছেন না তিনি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ‘ইঙ্গিত’ দেখি ‘সংগীত’ দেখি না। সরকারকে নির্দয় ভালোবাসার দিকে যেতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ৬৪ জন মিলে সরকার পরিচালনা চ্যালেঞ্জের। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। তবে সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখন অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইতিবাচক ছিল না। এই দুই কারণে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল ছিল। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুদ্ধ চলছে। এসবও বিবেচনায় নিতে হবে।
জ্বালানি-সংক্রান্ত একটা মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা কেন হলো না প্রশ্ন তুলে ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে একটা উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে, কিন্তু তার ফলাফল জানা গেল না। দেশের ভূখণ্ডে ভূখণ্ডে জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে এলএনজি আমদানির লবির কাছে জিম্মি অবস্থা থেকে বেরোতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে সরকার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না। বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না। বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে। এত দেরি না করে শুরুতে যদি ২০-২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে দিয়ে বাস্তবায়নে সময় চাইলে ভালো হতো।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা সরকারি নীতির ঘোষণাই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবে না।
সিপিডির প্রতিবেদেন বলা হয়, গত তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে আমদানি বেড়েছে, মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে এবং ঋণপত্র খোলার হারও বেড়েছে। এর পেছনে কারণ জানতে এক সংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, চাহিদা বৃদ্ধি ও আমদানি পণ্য যন্ত্রের দাম বাড়ার কারণে আমদানি ইতিবাচক হয়ে থাকতে পারে।
ইতিবাচক দিক
সরকারের গত ছয় মাসে ইতিবাচক দিক প্রসঙ্গে সিপিডি বলেছে, সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। চাঞ্চল্যকর একটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিষয়টিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। এছাড়া সমুদ্র এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান ভালো পদক্ষেপ। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিকদের জন্য মেট্রোরেল ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সিপিডি জানিয়েছে, সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ এবং এর ওপর জমা হওয়া সুদ মওকুফ করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলো যোগ্য কৃষকদের ঋণ অবলোপন করেছে। এগুলো ভালো পদক্ষেপ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত খরচের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।
বাস্তবসম্মত কোর বাজেটের পরামর্শ
সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার কী কী সংকট পেয়েছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সমন্বিত দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন সময়ে সংকটের কথা বলা হলেও সেগুলোর তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।
সিপিডি মনে করে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হবে। এক বছরের ভেতরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শেষ করে প্রবৃদ্ধির দিকে এগোনোর পরিকল্পনা অতিকথনের মতোই শোনা যাবে। এ পরিস্থিতিতে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট একটা সময়রেখা ঘোষণা ও খুব সুনির্দিষ্টভাবে এক একটা বাস্তবসম্মত কোর বাজেট তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
জ্বালানি, ব্যাংক সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ, নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা, ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া দিয়েছে সিপিডি। সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সংসদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করারও কথা বলা হয়েছে সিপিডির পক্ষ থেকে।