স্বাধীনতার পর ইতিহাসনির্ভর সিনেমা নির্মাণ যেন একসময় জাতীয় দায়িত্বের মতো হয়ে উঠেছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম তিন বছরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরকারের অর্থায়নে ১৩টি সিনেমা নির্মিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। সেই ধারার অন্যতম ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২)। চাষী নজরুল ইসলামের এই সিনেমা মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসাবে বিশেষ মর্যাদা পায়। এরপর ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘সংগ্রাম’, ‘আলোর মিছিল’, একের পর এক সিনেমায় উঠে আসে যুদ্ধের নানা বাস্তবতা।
তবে ইতিহাস শুধু ১৯৭১-এ আটকে ছিল না। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৭৯) দেশভাগ-পরবর্তী সমাজ ও মানুষের সংকটের দিকে তাকিয়েছে। তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পারে’ দেশভাগের ট্র্যাজেডিকে সেলুলয়েডের ফিতায় ধারণ করেছে। আবার ‘মাটির ময়না’ (২০০২) ষাটের দশকের শেষভাগের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির পটভূমি সামনে আনে।
* মুক্তিযুদ্ধের গল্পে নতুন ভাষা
নব্বইয়ের দশক থেকে ইতিহাসনির্ভর সিনেমায় আবার উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ দেখা যায়। হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪) অবরুদ্ধ ঢাকার একটি পরিবারের চোখ দিয়ে একাত্তরকে দেখেছে। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫) প্রামাণ্য ফুটেজের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টকে সামনে এনেছে। তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতী’ (১৯৯৬) যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বিভাজন ও রাজাকারদের ভূমিকার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। পরে ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭), ‘গেরিলা’ (২০১১), ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১), ‘মেঘমল্লার’ (২০১৪), ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (২০১৫), ‘ভুবন মাঝি’ (২০১৭), বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছে।
এরপর ‘জেকে ১৯৭১’ (২০২৩)-এ উঠে আসে ফরাসি তরুণ জ্যঁ ক্যুয়েরের বাংলাদেশের পক্ষে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা। একইসময় ‘১৯৭১ সেই সব দিন’, ‘ওরা ৭ জন’, ‘দামাল’-এর মতো সিনেমাও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গল্প সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে মুক্তি পায় আকরাম খানের ‘নকশী কাঁথার জমিন’, হাসান আজিজুল হকের ‘বিধবাদের কথা’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা যুদ্ধের অভিঘাতকে দুই নারীর জীবনের মধ্যদিয়ে দেখেছে।
ভাষা আন্দোলন নিয়েও দীর্ঘ বিরতির পর আসে তৌকীর আহমেদের ‘ফাগুন হাওয়ায়’ (২০১৯)। মফস্বল শহরের সাধারণ মানুষের জীবনে ১৯৫২-এর অভিঘাতকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাটি দেখিয়েছে, ইতিহাস মানেই শুধু বড় নেতা বা বড় ঘটনা নয়, ইতিহাসের ভেতরে থাকে সাধারণ মানুষেরও জীবন।
অর্থাৎ ইতিহাসনির্ভর সিনেমা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ২০২৪ সালে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে ‘অবিনশ্বর’ নামের ডকু-ফিকশনও নির্মিত হয়েছে।
* তবু কেন এই খরা
সমস্যাটা এখানেই, বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ থাকলেও ইতিহাসনির্ভর সিনেমা আর ধারাবাহিক কোনো নির্মাণধারা নয়। বিশেষ করে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় ইতিহাসের উপস্থিতি খুবই সীমিত। নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলও এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের মূলধারার সিনেমায় ইতিহাসচেতনার ঘাটতির কথা বলেছেন। তার মতে, ১৯৪৭-এর দেশভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাংলাদেশের সিনেমায় প্রায় অনুপস্থিত; এমনকি ১৯৭১-ও মূলধারায় অনেকাংশে অনুপস্থিত।
এর পেছনে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বড় কারণ। ইতিহাসনির্ভর সিনেমায় সময়কাল পুনর্নির্মাণ, পোশাক, লোকেশন, সেট, গবেষণা ও যুদ্ধদৃশ্য-সবকিছুর জন্য বাড়তি বাজেট প্রয়োজন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সেন্সর, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ইতিহাসকে কতটা নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করা হবে, এ প্রশ্নগুলোও।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে দর্শকের অভ্যাসে। দ্রুত বিনোদন, তারকাকেন্দ্রিক গল্প ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের চাপে ইতিহাসের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ধীর নির্মাণ অনেক নির্মাতার কাছে বাণিজ্যিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে পারে। অথচ ইতিহাসের গল্পেই নতুন প্রজন্মের জন্য অসংখ্য অজানা চরিত্র, ঘটনা ও সংঘাত লুকিয়ে আছে।
* যে তালিকা আরও বড় হতে পারত
ইতিহাসনির্ভর উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি সিনেমার মধ্যে রয়েছে খান আতাউর রহমানের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৬৭), জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২), সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭২), ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩), আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (১৯৭৩), চাষী নজরুল ইসলামের ‘সংগ্রাম’ (১৯৭৪), মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৭৯), হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪), তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫), তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতী’ (১৯৯৬), চাষী নজরুল ইসলামের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭), তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ (২০০২), নাসিরউদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ (২০১১), মোরশেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১), তৌকীর আহমেদের ‘ফাগুন হাওয়ায়’ (২০১৯), ফাখরুল আরেফীন খানের ‘জেকে ১৯৭১’ (২০২৩), হৃদি হকের ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ (২০২৩), আকরাম খানের ‘নকশী কাঁথার জমিন’ (২০২৪)।
তালিকাটি দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি রুত্বপূর্ণ বাঁকেই কোনো না কোনো সময় সিনেমা নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সেই ধারার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ধারাবাহিকতার অভাব। ২০২৪ সালে ‘নকশী কাঁথার জমিন’-এর মতো সিনেমা এলেও একই বছরে কিংবা এরপর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আর কোনো সিনেমা ছিল না।
তবে, ইতিহাস বাংলাদেশের সিনেমায় নেই, এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। বরং সত্যটা হলো, ইতিহাসনির্ভর সিনেমা এখন নিয়মিত সিনেমাচর্চার অংশ নয়; বিচ্ছিন্ন কিছু সাহসী নির্মাতার উদ্যোগে টিকে আছে।
অথচ যে জাতির জন্মই ইতিহাসের এক অসাধারণ রাজনৈতিক ও মানবিক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে, তার সিনেমায় ইতিহাসের এ অনুপস্থিতি শুধু শিল্পের সংকট নয়, এটি স্মৃতি সংরক্ষণেরও সংকট। পর্দা যদি সময়ের আয়না হয়, তবে সেই আয়নায় বাংলাদেশের অতীতের এত অল্প প্রতিফলন কেন, এ প্রশ্নটিই এখন নতুন করে সামনে আনার সময়।