ঢাকা, ২০ জুলাই, ২০২৫: নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবজি, মাছ, মাংস – কোনো কিছুতেই স্বস্তি মিলছে না। আয়ের সাথে ব্যয়ের অসংগতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় আরও বেড়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো কারণ ছাড়াই ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে চলেছেন, অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
বাজারের চিত্র: ক্ষোভ আর হতাশা
রাজধানীর বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ব্রয়লার মুরগি ও সোনালী মুরগির দাম নতুন করে বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, বৈরী আবহাওয়া ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে দাম বাড়ছে। ইলিশের ভরা মৌসুমেও দাম আকাশছোঁয়া। কেজি আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ টাকায়। দেশি পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরেও কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারেও আগুন। বৃষ্টির অজুহাতে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম চড়া। কাঁচা মরিচের কেজি ২০০ টাকা ছুঁয়েছে। অন্যান্য সবজির দামও কেজি প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিক্রেতারা সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করলেও, ক্রেতাদের অভিযোগ, এটি ব্যবসায়ীদের পুরোনো অজুহাত।
ভোগান্তির শেষ কোথায়?
নিত্যপণ্যের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে সাধারণ মানুষ। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে খাবারের তালিকা ছোট করছেন, বাদ দিচ্ছেন মাছ-মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবার।
একজন ক্রেতা হতাশার সুরে বলেন, “প্রতি সপ্তাহেই বাজারে এসে নতুন নতুন দাম শুনি। আমাদের আয় তো বাড়ছে না, কিন্তু খরচ বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা বাঁচব কীভাবে?”
আরেকজন ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সিন্ডিকেটের কাছে সবাই জিম্মি হয়ে পড়েছে।”
দাম বাড়ার নেপথ্যে
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বৈরী আবহাওয়া ও সরবরাহ সংকট: অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে অনেক জায়গায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে।
- পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে পণ্যের দামে।
- আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব: কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ার কারণে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে।
- সিন্ডিকেটের কারসাজি: অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
- বাজার মনিটরিংয়ের অভাব: বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো এবং ধারাবাহিক মনিটরিংয়ের অভাবকে দায়ী করছেন অনেকে।
সরকারি পদক্ষেপ ও তার কার্যকারিতা
ভোক্তাদের ভোগান্তি কমাতে সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপের কথা বললেও, তার সুফল সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে বাজার অভিযানের কথা বলা হলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা না করে, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একইসাথে, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা বা ন্যায্যমূল্যের দোকান আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।
যতদিন পর্যন্ত বাজার নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হবে, ততদিন ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে বলে মনে হয় না। কবে ফিরবে স্বস্তি, সেই উত্তরই এখন খুঁজছে দেশের কোটি কোটি মানুষ।