ঢাকা, ২৯ আগস্ট ২০২৫: যানজট ও গণপরিবহনে নৈরাজ্য নিরসনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার সমস্ত বাসকে একটি একক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এই ঘোষণা আসার পর নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে আশা ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। যানজটমুক্ত ও শৃঙ্খল এক গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের হলেও, অতীতের ব্যর্থ প্রচেষ্টাগুলো এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যানজটের কারণে ঢাকায় গাড়ির গতি অনেক সময় হাঁটার গতির চেয়েও কমে আসে, যা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট করে এবং দেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল ক্ষতিসাধন করে। এই অচলাবস্থা নিরসনে একক বাস ব্যবস্থাপনাকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত করে শহরের সমস্ত বাসকে এর অধীনে নিয়ে আসা হবে। এই ব্যবস্থায় বাসগুলোর মালিকানা বেসরকারি থাকলেও, সেগুলো একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর পরিকল্পনা অনুসারে, সমগ্র রাজধানীকে ৯টি ক্লাস্টারে (ভিন্ন ভিন্ন রঙের) ভাগ করে মোট ৪২টি রুটে বাস চলাচল করবে। প্রতিটি রুটে একটিমাত্র কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে, যা অসম প্রতিযোগিতা এবং যাত্রী তোলার জন্য বেপরোয়া বাস চালানো বন্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করা এবং ভাড়ায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় বাস রুট শৃঙ্খলার উদ্যোগ এটাই প্রথম নয়। ২০১৫ সালে বাস রুট রেশনালাইজেশনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু রুটে বাসও চালু করা হয়। তবে বিভিন্ন কারণে সেই উদ্যোগগুলো পুরোপুরি সফল হয়নি। অতীতের ব্যর্থতার পেছনে মূল কারণগুলো ছিল:
- পরিবহন মালিকদের সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাব: প্রভাবশালী বাস মালিকদের একটি বড় অংশ এই ব্যবস্থার বিরোধী ছিল, কারণ এটি তাদের অনিয়ন্ত্রিত মুনাফা এবং ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরত।
- সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার অভাব: সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং অপর্যাপ্ত বাস সরবরাহ করতে না পারা এই উদ্যোগকে শুরুতেই হোঁচট খেতে বাধ্য করে।
- অবৈধ ও অনুমোদনহীন বাসের দৌরাত্ম্য: নির্দিষ্ট রুটে পরিকল্পিত বাস চালুর পরেও অনুমোদনহীন বাসগুলোর চলাচল বন্ধ না করায় যাত্রী ভাগাভাগি নিয়ে বিশৃঙ্খলা থেকেই যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই নতুন ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, বাসগুলোকে কয়েকটি রুটের অধীনে আনা গেলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে এবং উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে।
সাধারণ যাত্রীরা এই উদ্যোগকে একটি বড় পাওয়া হিসেবে দেখলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান। একজন যাত্রী বলেন, “সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখিনি। যদি এবার সফল হয়, তাহলে আমাদের অনেক ভোগান্তি কমবে।”
ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও মনে করেন, বাসগুলো নির্দিষ্ট রুট ও স্টপেজ মেনে চললে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে, রোড মার্কিং এবং নির্দিষ্ট পার্কিং স্থানের অভাবের মতো অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোও সমাধানের আহ্বান জানান তারা।
অন্যদিকে, ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, “রাজধানীতে বিশৃঙ্খলভাবে চলা বিভিন্ন কোম্পানির গাড়িগুলোকে হয় সরিয়ে দিতে হবে, নয়তো একত্র করে রুটে ভাগ করে দিতে হবে। এই মুহূর্তে এটি বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব তা নিয়ে আমি সন্দিহান।”
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে বাসচালক ও সহকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দৈনিক জমার ভিত্তিতে বাস চালানোয় অভ্যস্ত এই বিশাল শ্রমজীবী গোষ্ঠী নতুন ব্যবস্থাপনায় তাদের কর্মসংস্থান ও আয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তিত। তাদের বেতন কাঠামো কী হবে এবং কীভাবে তাদের এই নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি।
নতুন এই ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরিবহন মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং চালক-শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে তাদের নতুন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করা। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি বিস্তারিত, স্বচ্ছ ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করবে। যদি এই একক বাস ব্যবস্থাপনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি কেবল ঢাকার যানজটই কমাবে না, বরং নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই আশার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতার উপর। এবারের উদ্যোগটিও আগেরগুলোর মতো ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ঢাকার রাস্তায় সত্যিই শৃঙ্খলা ফিরবে—তা সময়ই বলে দেবে।