
মুনতাহিনা আক্তার বিশেষ প্রতিনিধি
গত এক দশকে বাংলাদেশে মাইক্রোফাইন্যান্স খাতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দারিদ্র্য হ্রাস ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি এখন আরও বেশি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে ৭৪২টিরও বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান (MFI) এবং ৪ কোটি ঋণগ্রহীতা নিয়ে বাংলাদেশের মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচিত। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA)-এর তথ্যমতে, এই খাতে বছরে ১.৬০ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি আর্থিক লেনদেন হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি খাতটিতে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে। MRA-এর সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রায় ৯.৩% প্রতিষ্ঠান সুশাসন ও আর্থিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রদর্শন করেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ৪২টি প্রতিষ্ঠানে সতর্কতা নোটিশ প্রদান এবং ১১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে।গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বহুবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, মাইক্রোফাইন্যান্সের লক্ষ্য শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং মানুষকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি বলেছেন: “অর্থ হলো উদ্যোক্তা হওয়ার অক্সিজেন।
যখন দরিদ্র মানুষকে অর্থের সুযোগ দেওয়া হয়, তারা জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং উদ্যোক্তা হয়ে দাঁড়ায়।” তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কিছু প্রতিষ্ঠানে সুদের অপব্যবহার দেখা দিতে পারে: “মাইক্রোক্রেডিট হলো গরিব মানুষের জীবন বদলানোর হাতিয়ার; এটি কোনোভাবে মুনাফা কামানোর ব্যবসা হওয়া উচিত নয়।” এছাড়া তিনি সামাজিক ব্যবসা-ভিত্তিক স্বচ্ছ মডেলের কথা তুলে ধরে বলেছেন যে দরিদ্র মানুষের জন্য একটি স্বচ্ছ ও মানবিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-ও তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, সুবিধাভোগীর তালিকা পরিবর্তন, এবং অতিরিক্ত অবৈধ সেবাশুল্ক আদায়ের মতো দুর্নীতির বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছে।
এসব সমস্যার সমাধানে মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটাচ্ছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ বড় MFI ম্যানুয়াল হিসাব পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৮০%-এর বেশি বড় প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক রিপোর্টিং সিস্টেমে রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। এছাড়া ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার ঘটেছে; বর্তমানে ৫৮% ঋণগ্রহীতা মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধ করেন। এতে নগদ লেনদেনের ঝুঁকি কমছে এবং অডিটের স্বচ্ছতা বাড়ছে।
শুধু তাই নয়, BRAC, ASA এবং BURO Bangladesh এর মতো শীর্ষ MFIs বায়োমেট্রিক সনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে, যা জাতীয় পরিচয় ডেটাবেসের সাথে সংযুক্ত। এর ফলে ঋণগ্রহীতার পরিচয়-সংক্রান্ত জালিয়াতি ও দ্বৈত ঋণ গ্রহণের ঘটনা কমে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মনিটরিং ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করছে, যেখানে শাখা-স্তরের কার্যক্রম রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
BRAC এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক অডিট সিস্টেমও পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে, যা অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করতে সক্ষম।
এছাড়া MRA-এর সহায়তায় কিছু প্রতিষ্ঠান ব্লকচেইন-ভিত্তিক মাইক্রো-লেজার সিস্টেম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করছে, যাতে তথ্য পরিবর্তন বা জালিয়াতির সুযোগ না থাকে। মাঠপর্যায়ে অনিয়ম কমাতে GPS-ভিত্তিক ভিজিট যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যাতে ফিল্ড অফিসারদের কার্যক্রম স্বচ্ছ থাকে। তবে সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম নয়; ছোট-মাঝারি MFIs-এ এখনো প্রযুক্তি অবকাঠামোর ঘাটতি, উচ্চ খরচ এবং কর্মীদের সীমিত ডিজিটাল দক্ষতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৩ সালে ৬টি ডেটা ব্রিচ ঘটনা ঘটেছে, যা সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণ ও শক্তিশালী সুশাসন কাঠামোই মাইক্রোফাইন্যান্স খাতকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করবে। ইতোমধ্যে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের মধ্যে সকল MFIs-কে আন্তর্জাতিক আর্থিক রিপোর্টিং মানদণ্ড (IFRS) অনুসরণ করতে হবে, এবং অটোমেটেড অডিট সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা হবে। যদিও মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের চাকরি-নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং গ্রামাঞ্চলের প্রযুক্তি সুবিধার সীমাবদ্ধতা এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, তবুও বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পুরো খাতটি সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে।মাইক্রোফাইন্যান্স ও আর্থিক সুশাসনের প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ ভুইয়া ২৪ মে ২০২৫ তারিখে বলেছেন যে, তার মন্ত্রণালয় সততা, দায়িত্ব এবং সুশাসনের একটি উদাহরণ স্থাপন করবে।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে তারা অ্যাংটি-করাপশন কমিশনের (ACC)-এর সঙ্গে সহযোগিতা করছেন, এবং বলেছিলেন: “যে কেউ হোক না কেন, দেশের আইন অনুসারে দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অপর এক বক্তব্যে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রোপাগান্ডা, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং প্রতিষ্ঠানের অবনতি নিয়ে।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, যার মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত, পুনরুদ্ধারের জন্য সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে।
বাংলাদেশের মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের এই রূপান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা অর্জন করে এই খাতটি দারিদ্র্য হ্রাস, নারী ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে আগামী দিনগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।