leadingnews.net
সর্বশেষ :
leadingnews.net এ আপনাকে স্বাগতম।।। নিত্য নতুন খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথে থাকুন।।। ধন্যবাদ।।।

বাংলাদেশে শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল কোন কোন বছরে?

  • আপডেট সময় : শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪১ বার পঠিত

কথায় আছে, ‘পৌষের শীত মোষের গায়, মাঘের শীতে বাঘ পালায়’। অর্থাৎ, পৌষের শীতে মোষ কাতর হয়, আর বাঘ জড়সড় থাকে। কিন্তু মাঘের শীতে বাঘও কাতর হয়।

পৌষ ও মাঘ, এই দুই মিলে শীতকাল। আর ইংরেজি ক্যালেন্ডার হিসেবে বাংলাদেশ ও এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে জানুয়ারিকে বলা হয় বছরের শীতলতম মাস।

যদিও শীতের আবহ আসতে শুরু করে পৌষের (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) মাঝামাঝি সময় থেকে। আবার অনেক সময় অগ্রহায়ণ (নভেম্বর-ডিসেম্বর) থেকেই শীতের বাতাস টের পাওয়া যায়।

এবারের শীতকালও তার ব্যতিক্রম নয়। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে, অর্থাৎ পৌষের এই মাঝামাঝি সময়েই দেশজুড়ে যে মাত্রায় শীত পড়েছে, তাতে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে টানা কয়েক দিন বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সূর্যের দেখা মেলেনি। চারদিক ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা। বিশেষ করে গত ২৯ ডিসেম্বর।

এমনও হয়েছে যে মাথা থেকে পা পর্যন্ত শীতের কাপড়ে মুড়িয়ে কেউ রাস্তায় হাঁটছে, কিন্তু মনে হচ্ছে নাকে-মুখে যেন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। মজার বিষয় হলো, এই বিষয়টি অনুভব করলেও চোখে দেখা যায়নি। অনেকের কাছে এটিকে তুষারপাতও মনে হয়েছে।

ইতিহাস বলছে, এবারের শীতে মানুষ যে ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, এই অঞ্চলের মানুষ এর আগে আরও বেশি হাঁড় কাপানো-হিমশীতল শীতকাল দেখেছে।

সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কবে, কোথায়, কত ছিল?

বর্তমানে দেশজুড়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের মোট ৪৮টি আবহাওয়া স্টেশন রয়েছে।

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্ম হয়। তার আগে এটি প্রথমে ব্রিটিশ ভারতের, পরবর্তীতে পাকিস্তানের অংশ ছিল।

তবে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে সেই ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় থেকে, অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড আছে।

যদিও তখন স্টেশন সংখ্যা এত বেশি ছিল না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো বাড়িয়েছে সরকার।

আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত ওই সময়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নীচে নেমেছিলো, আর তা একাধিকবার।

১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন, তিন দশমিক তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস।

চার বছরের মাথায় শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রার পারদ আরও নীচে নামে। ১৯৬৮ সালের চৌঠা ফেব্রুয়ারি সেখানকার তাপমাত্রা রেকর্ড হয় দুই দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৯৬৮ সালের রেকর্ডকে সহসা ছুঁতে পারেনি।

কিন্তু ঠিক ৫০ বছর পর, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের শীত ওই রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। সে বছর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সাম্প্রতিক বছরগুলো নয় শুধু, ইতিহাসে এটিই হলো এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে কম তাপমাত্রা।

ওই একই বছর উত্তরাঞ্চলের বিভাগ রংপুরের সৈয়দপুরের তাপমাত্রাও রেকর্ড ভেঙ্গেছিলো, এটি গিয়ে ঠেকেছিলো দুই দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

২০১৮ সালে উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারীর ডিমলা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট এবং দিনাজপুরের তাপমাত্রা ছিল তিনের ঘরে।

সেগুলো হলো যথাক্রমে– তিন, তিন দশমিক এক এবং তিন দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

সেসময় রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরের তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে তিন দশমিক পাঁচ, তিন দশমিক দুই ও তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এই তালিকায় আছে রাজশাহীও। ২০০৩ সালে সেখানকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় তিন দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মাঝে অন্যতম।

উত্তরাঞ্চলেই কেন বেশি শীত?

সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড বলছে, শীতকালে উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রাই সবসময় সবচেয়ে কম থাকে। এর কারণ, শৈত্যপ্রবাহ বা তাপদাহের প্রবেশদ্বার হলো বাংলাদেশের ওই অঞ্চল।

শীতকালে উত্তর ভারতের দিল্লি-কাশ্মীর অঞ্চল খুব ঠাণ্ডা থাকে। আর পৃথিবীর স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের নিয়ম অনুযায়ী বাতাস পশিম থেকে পূর্ব দিকে যায়।

অর্থাৎ, ভারতের দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া বেল্ট ধরে তা বাংলাদেশে ঢোকে।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলছিলেন, বাংলাদেশের উত্তর দিক থেকে সরাসরি বাতাস ঢুকতে পারে না, হিমালয়ের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়। আর সাগরে যেহেতু তাপ আদান-প্রদান হয়। তাই, পাহাড়-সাগর এড়িয়ে হিমালয় ও উত্তর ভারতের ঠাণ্ডা বাতাস ওই মাঝামাঝি বেল্ট ধরে প্রবেশ করে।

আর এই বাতাসের পথে উত্তরাঞ্চল প্রথম পড়ে বলেই সেখানে এত বেশি ঠান্ডা লাগে।

পাশাপাশি, উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা বেশি হয়, যা সূর্যের আলোকে ভূপৃষ্ঠে ঢুকতে দেয় না। ফলে দিনের বেলাতেও সেখানকার তাপমাত্রা কম থাকে।

আবার, উত্তরাঞ্চলে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ থাকায় রাতে তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়, তাই সেখানে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়।

ওই বছরগুলোয় তাপমাত্রা সর্বনিম্ন হওয়ার কারণ

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ওই বছরগুলোয় শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যেমন, টানা কয়েক দিনের কুয়াশা, শক্তিশালী শৈত্যপ্রবাহ, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কিংবা রাতের পরিষ্কার আকাশ।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেছেন, অনেকসময় বাতাসের স্তর বদলে উপরে থাকা জেট উইন্ড বা শক্তিশালী বাতাস নীচে নেমে আসে বা কুয়াশা কেটে যায়। যেখানে এটি ঘটে, তখন সেই জায়গার কুয়াশা সরে যায় ও (ভূমির তাপ দ্রুত ওপরে উঠে) তাপমাত্রা কমে। তবে এটা ব্যতিক্রম। ওই বছরগুলোতেও হয়তো এমন কিছু হয়েছিলো।

তিনি আরও বলেন, ওই বছরগুলোর তাপমাত্রা একেবারে নির্ভুল ধরা যাবে না।

কারণ, আগের তুলনায় এখনকার প্রযুক্তি অনেক আধুনিক, তখন স্টেশনও কম ছিল এবং অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল থার্মোমিটার ছিল। আশেপাশের সব স্টেশনে একই মাপ হলে বোঝা যেত। আর তাপমাত্রা কমার পেছনে স্থানীয় আবহাওয়ারও প্রভাব থাকতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, হিমালয়ের পাদদেশে কখনও কখনও উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়। তখন সেখান থেকে খুব ঠান্ডা হিমেল বাতাস বয়ে এসে বাংলাদেশে ঢোকে এবং শীত বাড়ে। সেইসাথে, উর্ধ্বাকাশে থাকা ঠান্ডা ও দ্রুতগতির বাতাসের ধারা, জেট স্ট্রিম সাধারণত অনেক ওপর দিয়ে বয়ে যায়। কিন্তু যখন এটি নিচের দিকে নেমে আসে, তখন ঠান্ডার অনুভূতি বেড়ে যায়।

তীব্র শীতের অনুভূতির মূল কারণ কুয়াশা?

বাংলাদেশে শীতের তীব্র অনুভুতির জন্য মূলত ভারী কুয়াশাকেই দায়ী করছেন আবহাওয়াবিদরা।

কারণ কুয়াশা যখন দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে, তখন সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছায় না, ফলে মাটি গরম হতে পারে না। এ কারণে শীত বেশি অনুভূত হয়।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, কুয়াশা কেটে গেলে ঠাণ্ডার অনুভূতি কমে। আর কুয়াশা কাটার প্রধান উপায় হলো বৃষ্টি হওয়া এবং বাতাসের গতিবেগ বাড়া। বাতাসের গতি ঘণ্টায় আট থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি হলে কুয়াশা কেটে যায়।

তবে বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বঙ্গোপসাগরে একটি উচ্চচাপ বলয় তৈরি হওয়া এবং সেইসাথে লোকালাইজড ওয়েস্টার্লি ডিসটার্বেন্সের বর্ধিতাংশ থাকা দরকার, জানান তিনি।

উচ্চচাপ বলয় মানে হলো, ওই এলাকায় বাতাসের চাপ বেশি থাকা। বাতাস সবসময় উচ্চচাপ এলাকা থেকে নিম্নচাপ এলাকার দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ তৈরি হলে সেখান থেকে আশপাশের নিম্নচাপের দিকে বাতাস জোরে বইতে শুরু করে।

আর ‘ওয়েস্টার্লি ডিসটার্বেন্স’ হচ্ছে পশ্চিম দিক থেকে আসা একটি আবহাওয়াগত অস্থিরতা, যা শীতকালে উপমহাদেশে ঠান্ডা বাতাস, মেঘ, বৃষ্টি বা ঝোড়ো হাওয়া নিয়ে আসে।

এর বর্ধিতাংশ সক্রিয় মানে, এই অস্থিরতার প্রভাব যদি বাংলাদেশ বা আশপাশের এলাকায় পৌঁছায় ও শক্তিশালী থাকে, তাহলে বাতাস আরও জোরালো হয়।

তবে, শীত বেশি লাগার আরেকটি কারণ হলো দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়া।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা প্রচুর বেড়েছে। আগে এরকম ছিল না। গত ২৯ ডিসেম্বর দিন রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য এক দশমিক সাত ছিল, আমি গত ২০ বছররেও এমনটা দেখিনি। আর এই ঘটনা শুধু এবার না, প্রতিবছর হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© 2025 | Leading Media & Communication ltd এর এক‌টি প্রতিষ্ঠান।
Design & Development By HosterCube Ltd.