
মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব, শায়খ সালাহ আল-বুদাইর তাঁর জুমার খুতবায় মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেক মানুষকে একদিন মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে। সেদিন কোনো সুপারিশ, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা কাজে আসবে না; প্রত্যেকেই তার আমলের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে আনা হবে। অতঃপর প্রত্যেক প্রাণকে তার কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮১)
দুনিয়ার গরম জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়
খুতবায় শায়খ আল-বুদাইর বলেন, গ্রীষ্মের প্রচ- তাপ একজন মুমিনকে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পৃথিবীর এই উত্তাপ ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু জাহান্নামের আগুন অনেক বেশি তীব্র, ভয়ংকর এবং চিরস্থায়ী শাস্তির স্থান।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “বলুন, ‘জাহান্নামের আগুন উত্তাপে অনেক বেশি তীব্র, যদি তারা বুঝতে পারত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৮১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘জাহান্নামের আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করল, ‘হে আমার রব! আমার এক অংশ অন্য অংশকে গ্রাস করছে।’ তখন আল্লাহ তাকে বছরে দুটি শ্বাস নেওয়ার অনুমতি দিলেন—একটি শীতকালে এবং একটি গ্রীষ্মকালে। এটাই তোমরা অনুভব করো সবচেয়ে তীব্র গরম এবং সবচেয়ে তীব্র শীত। ’ (সহিহ বুখারি, ৩২৬০)
ইমাম আল-বুদাইর বলেন, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো গুনাহ পরিত্যাগ করা, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং নেক আমলে নিজেকে সমৃদ্ধ করা। কারণ মানুষ যা বপন করবে, আখিরাতে তাই ঘরে তুলবে। যে নেক আমল করবে, সে জান্নাতের সৌভাগ্য লাভ করবে; আর যে পাপে নিমজ্জিত থাকবে, সে নিজের জন্য ক্ষতিরই ব্যবস্থা করবে। প্রকৃত সফল ব্যক্তি সে-ই, যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করে।
তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো—একটি মহৎ ইবাদত
দ্বিতীয় খুতবায় শায়খ আল-বুদাইর প্রচ- গরমে মানুষকে ঠা-া পানি পান করানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন।তিনি বলেন, তৃষ্ণার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পথচারীদের জন্য পানির ব্যবস্থা করা এবং আল্লাহর সৃষ্টির কষ্ট লাঘব করা ইসলামের অন্যতম মহান শিক্ষা। তিনি হাদিসে কুদসির কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পান করাওনি।’ বান্দা বলবে, হে আমার রব! আমি কিভাবে আপনাকে পানি পান করাব, অথচ আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক? তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে পানি পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পানি পান করাতে, তবে তার প্রতিদান আমার কাছেই পেতে।’ (সহিহ মুসলিম)
কূপ খনন ও পানির ব্যবস্থা
ইমাম আল-বুদাইর মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানান—এই প্রচ- গরমে রাস্তা, মসজিদ, বাজার ও জনসমাগমস্থলে পানির ব্যবস্থা করতে, কূপ খনন করতে, পানির ট্যাংক বা ঠা-া পানির ব্যবস্থা স্থাপন করতে এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের উপকারের জন্য একটি কূপ খনন করে, যেখান থেকে মানুষ, পশু কিংবা পাখি পানি পান করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে মহাপুরস্কারে ভূষিত করবেন। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন। (সহিহ বুখারি)
সমাজে সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান
খুতবার শেষাংশে শায়খ আল-বুদাইর মুসলিমদের স্মরণ করিয়ে দেন, প্রচ- গরমের সময় দরিদ্র, শ্রমজীবী, পথচারী, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও শিশুদের প্রতি বিশেষ দয়া প্রদর্শন করা ঈমানের দাবি। তাদের জন্য ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা করা, খাদ্য বিতরণ করা, ছায়ার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি মহান ইবাদত এবং আখিরাতের পাথেয়। প্রচ- গরম আমাদের শুধু ঋতুর পরিবর্তনের কথা স্মরণ করায় না; বরং জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহতা, কিয়ামতের জবাবদিহি এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর বাস্তবতাও স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই একজন মুমিনের উচিত এই দুনিয়ার সাময়িক কষ্ট থেকে শিক্ষা নিয়ে আখিরাতের অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
আসুন, আমরা আল্লাহকে ভয় করি, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকি, নেক আমলে প্রতিযোগিতা করি এবং তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে এক গ্লাস পানি তুলে দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাকওয়ার জীবন, মানবসেবার তাওফিক এবং জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তা দান করুন। আমিন।