বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, সিইপিএ কার্যকর হলে শুধু রপ্তানি নয়, শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য সক্ষমতা ধরে রাখতে এ চুক্তি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশের প্রধান নেগোসিয়েটর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তার, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান নেগোসিয়েটর পার্ক গিউন-ওহ এবং ডেপুটি প্রধান নেগোসিয়েটর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এফটিএ) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিশ্বের দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির একটি বড় দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির চূড়ান্ত আলোচনা শেষ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু সেই পরিমাণ বিনিয়োগ দেশে নেই। তাই রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার এ ধরনের বাণিজ্য চুক্তিতে যাচ্ছে, যা এলডিসি উত্তরণের পরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার তাড়াহুড়া করে এ চুক্তি চূড়ান্ত করেনি। দুই বছরের কাজ দিন-রাত পরিশ্রম করে মাত্র ছয় মাসে শেষ করে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। এটি কোনো গোপন বিষয় নয়; সবকিছুই উন্মুক্ত করা হবে। যে কেউ তা বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও বলেন, বাংলাদেশ ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ৫৬ বছরের। এতদিন সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত টেক্সটাইল খাত। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে একটি মহাসড়কের মতো সংযোগ তৈরি হবে। এখন সময় এসেছে প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা ও বিনিয়োগের মতো নতুন খাতে সম্পর্ক সম্প্রসারণের। তিনি বলেন, সিইপিএ কার্যকর হলে কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ আরও বাড়বে।
সেবা খাতে বড় অঙ্গীকার
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও দুই দেশ উল্লেখযোগ্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি উপখাতে সেবা বাণিজ্যের সুযোগ দেবে। এর ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৫ সালের ২২ থেকে ২৭ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে প্রথম দফা আলোচনা শুরু হয়। পূর্বনির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী মোট পাঁচ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে দুই দফা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দফা বৈঠক হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অনিষ্পন্ন বিষয়ে প্রধান নেগোসিয়েটর পর্যায়ে প্রায় ৪০টি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আলোচনার সমাপ্তি ঘটে।
বিশেষজ্ঞ মত
কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির বিষয়ে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক সমকালকে বলেন, এটি একটি ভালো নীতি উদ্যোগ। এর আগে জাপানের সঙ্গেও এ ধরনের চুক্তি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বার্তা যাবে, বাংলাদেশ এ ধরনের বাণিজ্য আলোচনা ও দরকষাকষিতে সক্ষম।