ঢাকা, ৩১ আগস্ট ২০২৫: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সরকার আগরতলা শহরের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের তিতাস নদী থেকে পানি ব্যবহারের একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এই প্রস্তাবটি ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা উত্থাপন করেছেন এবং বর্তমানে এটি প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা দুই দেশের মধ্যে পানি বন্টন নিয়ে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে।
ত্রিপুরা সরকারের মতে, আগরতলা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন এলাকার ৫১টি ওয়ার্ডে আয়রনমুক্ত ও বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা এই পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, তিনি এই প্রস্তাবটি নিয়ে গবেষণা করছেন এবং পরিকল্পনাটি সফলভাবে অগ্রসর হলে তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী সাহার বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রিপুরার হাওড়া নদী এবং কালাপানিয়া ও কাটাখালের মতো কিছু জলধারা বাংলাদেশের তিতাস নদীতে গিয়ে মেশে। এই সংযোগের ওপর ভিত্তি করেই তিতাস থেকে পানি উত্তোলনের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। সম্প্রতি তিনি আগরতলায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনারের কাছেও এই প্রস্তাবটি তুলে ধরেছেন।
তিতাস নদী মূলত বাংলাদেশের একটি নদী। এর উৎপত্তি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এবং এটি মেঘনা নদীর একটি উপনদী। নদীটি তার গতিপথে ভারতের ত্রিপুরার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং বেশ কিছু স্থানে দুই দেশের সীমান্তরেখা হিসেবেও কাজ করে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। যেহেতু পরিকল্পনাটি অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তাই আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে, অভিন্ন নদীর পানি বন্টন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত থাকায় দুই দেশের সম্পর্কে এর প্রভাব পড়েছে। এর আগে, মানবিক কারণে ত্রিপুরার সাবরুম শহরের জন্য ফেনী নদী থেকে সামান্য পরিমাণ (১.৮২ কিউসেক) পানি উত্তোলনে বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছিল। তিতাসের ক্ষেত্রে ভারতের প্রস্তাবের পরিমাণ এবং এর সম্ভাব্য পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব পর্যালোচনার পরেই বাংলাদেশ তার অবস্থান স্পষ্ট করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করা হলে তার ভাটি অঞ্চলে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে, কৃষি, মৎস্য, নৌচলাচল এবং সামগ্রিক পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই এই ধরনের যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে একটি নিরপেক্ষ যৌথ সমীক্ষার মাধ্যমে এর প্রভাব নিরূপণ করা অপরিহার্য।
তিতাস নদীর পানি ব্যবহার পরিকল্পনার পাশাপাশি এই নদীর দূষণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, আগরতলার পয়ঃনিষ্কাশনের পানি দুটি খালের মাধ্যমে তিতাস নদীতে গিয়ে পড়ছে এবং এর ফলে বাংলাদেশে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, যা স্থানীয়দের স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করছে। এই দূষণ রোধে ভারত সরকার একটি পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগার (Sewage Treatment Plant) স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
ভারতের এই পরিকল্পনাটি বর্তমানে একটি প্রস্তাবনার পর্যায়ে রয়েছে। এর কারিগরি দিক, যেমন – কোথা থেকে, কী পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানানো হয়নি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়া প্রয়োজন হবে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের (JRC) মাধ্যমে এই আলোচনা অগ্রসর হতে পারে। আগামী দিনে এই প্রস্তাবটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।