
নুসরাত জাহান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
রাত তখন ৩টা ২৫ মিনিট। চারদিকে থমথমে নিস্তব্ধতা। একটি ঘুমন্ত শহর—ঘুম নেই কেবল ফোনের স্ক্রিনে লিপ্ত থাকা নিশাচর প্রাণীটির চোখে। মস্তিষ্কও কাজ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, এখন তার বিশ্রাম দরকার। চোখের কোণে মৃদু ব্যথা অনুভূত হলো। অতঃপর আজ রাতের মতো ফোনটা রেখে ঘুমানোর চেষ্টায় চোখ দুটো বন্ধ করলেন।
কিন্তু হায়! বিন্দুমাত্র ঘুম আসছে না। এপাশ–ওপাশ করতে করতে রাত গড়িয়ে সকাল। যখন ভোরের সূর্য উঁকি দিলো, কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার মোক্ষম সময়—ঠিক তখনই আপনি মত্ত হলেন গভীর ঘুমে। পাখিদের সকাল হয়ে গেলেও আপনার সকাল হলো অনেক দেরিতে। দুপুর ১টার পরে টনটন করা ব্যথায় চোখ খুলে প্রথমেই খুঁজলেন—বালিশের পাশে ফোনটা কোথায়। বিছানা থেকে ওঠার আগে আবারও ডুব দিলেন রিল্সের দুনিয়ায়। অতঃপর আশেপাশের প্রতিটি জিনিসই ঝাপসা লাগতে শুরু করলো—এবং শুরু হলো বিপত্তি। ডাক্তার জানালেন—আপনার চোখের ৭০% ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে! এটা কি কোনো রোগ? চোখের অসুখ?—নাহ! এটা এক নীরব মহামারি, যে মহামারীতে আসক্ত পুরো আধুনিক মানবজাতি।
প্রযুক্তিনির্ভরতার যুগে এই দৃশ্য এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যমান। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সকলেই আসক্ত এই নীরব মহামারিতে। এই নীরব ঘাতক তিলে তিলে ক্ষয় করে দিচ্ছে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহ। চোখ—মানবদেহের প্রাকৃতিক ক্যামেরা। এই লেন্সেই আমরা দেখি সমগ্র সৃষ্টিকূল। কিন্তু আধুনিক যুগের অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা ধীরে ধীরে ঝাপসা করে দিচ্ছে এই মূল্যবান অঙ্গটিকে। নিয়মিত এই অভ্যাস অতিশীঘ্রই আপনার জীবন থেকে আলো কেড়ে নিতে পারে। তখন পতিত হতে হবে এক গভীর অন্ধকার জগতে—যেখান থেকে আর ফিরে আসাও কঠিন।
একজন মানুষ সাধারণত গড়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৪ থেকে ১৭ বার চোখের পলক ফেলে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮৪০ থেকে ১,০২০ বার। এই হারটি ব্যক্তিভেদে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। যেমন: পড়ার সময় বা কোনো কিছুতে মনোযোগ দিলে পলক ফেলার হার কমে যায়।
ফোনের স্ক্রিনে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার দরুন প্রতি মিনিটে পলক ফেলার পরিমাণ কমে এসে মাত্র ৪–৫ বারে নেমে যায়। যার ফলে চোখের অশ্রুস্তর শুকিয়ে যায়। চোখের কর্নিয়ায় কোনো রক্তনালী না থাকায় এখানকার কোষগুলো সরাসরি এই অশ্রুস্তর থেকেই অক্সিজেন শোষণ করে। এছাড়াও এই অশ্রুস্তরে থাকে চোখের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম, যা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে চোখকে সংক্রমণমুক্ত রাখে। এভাবে একনাগাড়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা, ফোনের নীল রশ্মি, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের অভাব এবং ব্যাকটেরিয়া জমে থাকা—এসবের ফলে চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যা দেখা দিতে পারে। যা ধীরে ধীরে অন্ধত্বের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। চোখের এসব সমস্যাকে কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল স্ক্রিনের কারণে বিশ্বের প্রতিটি তিনজন যুবকের একজন এখন ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’-এ আক্রান্ত।
চোখের ক্ষতির পাশাপাশি দেখা দিতে পারে বিভিন্ন পর্যায়ের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, অবসন্নতা, ঘুমের ব্যাঘাত, ক্ষুধামন্দা—এমনকি এটি আপনার মস্তিষ্কের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে স্মৃতিশক্তি ক্রমে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ দিনে অর্ধেক সময়ই ফোনের পেছনে নষ্ট করে ফেলে। এমনকি রাতের বিশ্রামের সময়টুকুও স্ক্রিনে অপচয় করে, যা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার পাশাপাশি পড়াশোনা, কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এবং আমেরিকাসহ বিভিন্ন সংস্থার (২০২৩–২০২৪) গবেষণা অনুযায়ী মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করে, অর্থাৎ তাদের স্ক্রিন টাইমও প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা। তবে বর্তমান জেন জেড (Gen-Z) প্রজন্মের ক্ষেত্রে এতে বিশাল ব্যবধান দেখা যায়। তাদের স্ক্রিন টাইম অনেক ক্ষেত্রে ৭–৮ ঘণ্টারও বেশি, যা তাদেরকে এক অন্ধকার জীবনের দিকে ধাবিত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি ফোনের স্ক্রিনে সময় না দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে।
এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ফোনের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনতে হবে। একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে না থেকে কিছুক্ষণ পর পর দূরের কোনো কিছুর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চোখের কিছু ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। রাত জেগে ফোন দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিজ্ঞান বলে, ঘুমানোর কমপক্ষে ৩০–৪০ মিনিট আগে ফোন হাতে না নেওয়া উচিত। যেকোনো জিনিস—যেমন ভিডিও বা ছবি—একবার দেখার পর সেটি আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ২৫ মিনিট পর্যন্ত থেকে যায়। তাই ঘুমানোর পূর্বে ফোন থেকে বিরত থাকতে হবে। ফোনের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা পেতে চশমা ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অনেকাংশেই আমাদের চোখকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। দিনের শেষে স্ক্রিন নয়—আমাদের চোখই আমাদের জীবনকে আলো দেখায়।
বর্তমান বিশ্বে এই বৃহৎ সমস্যা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়; তবে সকলের সচেতনতা এবং পরিমিত ব্যবহারে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। সর্বোপরি আমরা যেনো আমাদের সুবিধার্থেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি—প্রযুক্তি যেনো আমাদের ব্যবহার করতে না পারে।