leadingnews.net
সর্বশেষ :
leadingnews.net এ আপনাকে স্বাগতম।।। নিত্য নতুন খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথে থাকুন।।। ধন্যবাদ।।।

বরের সঙ্গী থাকবে কারা? কনের কোন কোন অঙ্গ দেখতে পারবে?

  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার পঠিত

বিয়ে কেবল একটি সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি দাম্পত্য জীবনের সূচনা। তাই কনে দেখা বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। দাম্পত্য জীবনের পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনি এর সঙ্গে জড়িত দায়িত্ব, চ্যালেঞ্জ ও সমস্যাও অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ কারণে বিয়ের আগে পাত্র ও পাত্রীকে দেখা, বোঝা ও যাচাই করা জরুরি— যাতে পরবর্তী জীবনে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা দাম্পত্য জীবনকে দুর্বিষহ করে না তোলে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ইসলাম বিয়ের আগে কনে দেখার বিষয়ে সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

কনে দেখার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা

সাহাবি হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ

‘তোমাদের কেউ যদি কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, আর যদি তার জন্য বিয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী অঙ্গগুলো দেখার সুযোগ হয়, তাহলে সে যেন তা দেখে নেয়।’ (আবু দাউদ ২০৮২)

অন্য এক হাদিসে সাহাবি হজরত মুগিরা ইবন শোবা (রা.) বলেন, তিনি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করেন—

‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ তিনি বললেন, না। তখন নবী (সা.) বললেন—

فَلْيَنْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّ ذَلِكَ يُزِيدُ المَوَدَّةَ بَيْنَهُمَا

‘তুমি তাকে দেখে নাও। কেননা এতে তোমাদের দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা ও প্রণয় গভীর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।’ (তিরমিজি ১০৮৭)

এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—বিয়ের আগে কনে দেখা কেবল অনুমোদিতই নয়; বরং সুন্নাহসম্মত।

আমাদের সমাজের প্রচলিত ভুল রীতি

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়— বাবা, ভাই, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘটা করে কনে দেখার আয়োজন করা হয়। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই পদ্ধতি নাজায়েজ ও হারাম।

এমনকি শুধু নারী সদস্যদের নিয়ে ঘটা করে কনে দেখাও সমীচীন নয়। কারণ এভাবে দেখার পর যদি কোনো কারণে বিয়ে না হয়, তাহলে সেই মেয়েটি সামাজিকভাবে বিপাকে পড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তার বিয়ের ব্যাপারে নানা রকম সন্দেহ ও জটিলতা তৈরি হয়। কোনো মানুষকে এভাবে সামাজিক ক্ষতির মুখে ফেলা ইসলাম সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করেছে। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় তা ওঠে এসেছে এভাবে—

১. إِيَّاكُمْ وَالْخُلُوَّةَ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ ذُو عَارِضٍ

‘খালওয়াতা (পুরুষ–নারীর একান্ত দেখা) থেকে নিজেকে বিরত রাখো, কেননা শয়তানই পরিকল্পনার ক্ষেত্রে উপস্থিত থাকে।’ (বুখারি)

খালওয়তা নিষিদ্ধ—এটা শরিয়তে বিস্তৃতভাবে অশ্লীলতায় পৌঁছানোর পথ হিসেবে বিবেচিত।

২. وَلَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ

‘কোনো পুরুষ কোনো নারীকে একান্তে বসতে দেবে না— অথচ সেখানে মাহরাম উপস্থিত না থাকা— এটা হারাম।’ (মুসলিম)

কনে দেখার ক্ষেত্রে তাই মাহরামের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি।

৩. لا يدخل رجلٌ على امرأةٍ إلا مع ذي محرمٍ

‘মহিলা/নারীর সঙ্গে কোনো পুরুষ মহিলার মাহরাম ছাড়াই একান্তে যাবে না।’ (আবু দাউদ)

৪. الْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ

‘ফিতনা/পরীক্ষা (যা অসামাজিক সম্পর্কের দিকে পরিচালিত করে) এমন একটি বিপদ, যা হত্যা থেকেও ভয়ংকর।’ (তিরমিজি)

পাত্র-পাত্রী দেখা এমনভাবে করলে সামাজিক ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে— ইসলামি শরিয়ত সে কারণেই সতর্ক।

৫. من أعان على فساد وقع فيه فتاوى محمودية ٣/٢١٢

‘যে লোক কেও অনৈতিক ও অনিশ্চিত অবস্থায় সাহায্য করে— সেই লোক নিজেও অনৈতিকতার আওতায় পড়ে।’ (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া)

সমাজে কোনো প্রচলন চালু করে তা অন্যকে অসুবিধায় ফেলা—এটা শরিয়তে সমর্থনযোগ্য নয়।

কনে দেখার সারসংক্ষেপ হলো—

> ইসলাম কনে দেখাকে নিষেধ করেনি, বরং এটিকে সুন্নাহ ও প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করেছে— শর্ত হলো শালীনতা ও নিয়ত ঠিক থাকা।

> কিন্তু ঘটা করে আয়োজন, গায়ে ঘেষাঘেষি দেখা, একান্তে থাকা, দুষ্টলিপ্ত আলোচনা— এসব নাজায়েজ ও হারাম।

> সামাজিক কর্মকাণ্ড এমনভাবে পরিচালনা করা উচিত যাতে মেয়ের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকে।

কনে দেখার শরিয়তসম্মত সীমা

ইসলামের বিধান অনুযায়ী—

> বর কনের হাত ও মুখ দেখতে পারবে।

> কাপড়ের উপর দিয়ে শরীরের সামগ্রিক অবয়ব দেখে নেওয়াও বৈধ।

> এই দেখা কেবল বিয়ের উদ্দেশ্যেই হতে হবে, অন্য কোনো কারণে নয়। (হিদায়া ৪/৪৪৩; আল-মুগনি ৭/৭৪)

যদি নারীরা কনে দেখতে যায়, তাহলে তারা শরিয়তের সাধারণ পর্দার সীমা অনুযায়ী— নাভি থেকে হাঁটু বাদ দিয়ে— অবশিষ্ট শরীর দেখতে পারবে। (টীকা: আবু দাউদ ২/২৮৪)

সন্দেহ হলে কী করবেন?

কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা শারীরিক বিষয়ে সন্দেহ থাকলে, বিশ্বস্ত কোনো নারীর মাধ্যমে তা যাচাই করা যেতে পারে। এতে সরাসরি তাকানোর প্রয়োজন পড়ে না এবং শালীনতাও বজায় থাকে।

অনুমতি ও গোপনীয়তা প্রসঙ্গ

কনে দেখার জন্য পাত্রের পক্ষ থেকে কনের অভিভাবকদের পূর্বানুমতি নেওয়া আবশ্যক নয়। কোনো ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই, এমনকি কনে বা তার অভিভাবকদের অগোচরে দেখলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে তা বৈধ। সাহাবি হজরত জাবির (রা.) বলেন—

رَأَيْتُ الْمَرْأَةَ لَمَّا خُطِبَتْ لِي بِغَيْرِ إِذْنِ أَهْلِهَا

‘আমি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর কনেকে গোপনে দেখেছি।’ (আবু দাউদ ২০৮২)

বরং বিভিন্ন রেওয়ায়াতের আলোকে দেখা যায়—গোপন ও অনাড়ম্বরভাবে দেখাটাই অধিক সংগত ও নিরাপদ।

কুরআনের মূল নীতি

আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى

‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হইও না।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৩২)

মাহরামের উপস্থিতিতে কনে দেখা এই নীতি পূরণ করে—ফিতনা থেকে রক্ষা দেয়।

ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী পদ্ধতি

> ইসলামে কনে দেখার এই বিধান অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ।

> এতে যেমন বাড়াবাড়ি নেই, তেমনি অযথা কড়াকড়িও নেই।

এই নিয়ম মানলে—

> কনে পক্ষ সামাজিক বিপদ থেকে রক্ষা পায়

> বর পক্ষও অহেতুক ঝামেলা ও জটিলতা থেকে মুক্ত থাকে

উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির আরেকটি ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—  কনে দেখবে শুধু ছেলের অভিভাবকরা, বর নিজে কনেকে দেখলে নাকি দোষ। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ কনে দেখার বিষয়ে যেসব হাদিস এসেছে, সেখানে স্পষ্টভাবে বরকেই কনে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—অভিভাবকদের নয়।

বর কনেকে না দেখে শুধু অভিভাবকদের পছন্দের ওপর বিয়ে হলে, পরবর্তী সময়ে অপছন্দ, মনোমালিন্য ও দাম্পত্য অশান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের সমাজে এর বহু বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। তাই শরিয়ত ও বাস্তব— উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই বর কর্তৃক কনেকে দেখে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও যুক্তিসংগত পদ্ধতি।

ইসলাম চায়— বিয়ে হোক সচেতন, সম্মানজনক ও কল্যাণকর। কনে দেখার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্ধারিত সীমা মেনে চললে সমাজে অশান্তি কমবে, দাম্পত্য জীবনে আসবে স্থিতি ও প্রশান্তি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহসম্মত পথে বিয়ে করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© 2025 | Leading Media & Communication ltd এর এক‌টি প্রতিষ্ঠান।
Design & Development By HosterCube Ltd.