বর্ষণ শুধু প্রকৃতিকে সজীব করে না, এটি মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত ও নেয়ামতেরও প্রতীক। পবিত্র কোরআনে বৃষ্টিকে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন এবং মানুষের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামি শরিয়তে বৃষ্টির সময়কে দোয়া কবুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলা হয়েছে। তাই বৃষ্টি শুরু হলে বিরক্ত না হয়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার ও শুকরিয়া আদায়ের পরামর্শ দিয়েছেন ইসলামি স্কলাররা।
কোরআনে বৃষ্টির কথা
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ
অর্থ: “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা ও আকাশকে ছাদ বানিয়েছেন। আর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে তোমাদের জীবিকার জন্য নানা ফল-ফসল উৎপন্ন করেছেন।”
(সুরা আল-বাকারা: ২২)
আরও ইরশাদ হয়েছে—
يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ
অর্থ: “তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে দেবেন।”
(সুরা নূহ: ১১-১২)
বৃষ্টি আল্লাহর রহমত
মহান আল্লাহ আরও বলেন—
وَهُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ الْغَيْثَ مِنْ بَعْدِ مَا قَنَطُوا وَيَنْشُرُ رَحْمَتَهُ
অর্থ: “মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন।”
(সুরা আশ-শুরা: ২৮)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, বৃষ্টি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহর অসীম দয়া ও রহমতের বহিঃপ্রকাশ।
বৃষ্টির সময় দোয়া কবুল হয়
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বৃষ্টির সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
“দুই সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—আজানের সময় করা দোয়া এবং বৃষ্টির সময় করা দোয়া।”
(সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪০; সহিহুল জামে: ৩০৭৮)
তাই এ সময় গুনাহ মাফ, হালাল রিজিক, সুস্বাস্থ্য, নেক সন্তান, ঈমানের দৃঢ়তা এবং আখিরাতের সফলতার জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
বৃষ্টির সময় যে দোয়া পড়তেন নবীজি (সা.)
বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দোয়া পড়তেন—
اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ।
অর্থ: “হে আল্লাহ! এই বৃষ্টিকে আমাদের জন্য উপকারী বৃষ্টি বানিয়ে দিন।”
(সহিহ বুখারি: ১০৩২; সুনানে নাসাঈ: ১৫২৩)
বৃষ্টির পানি শরীরে লাগানো সুন্নত
হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের কাপড় সরিয়ে দেন, যাতে বৃষ্টির পানি তাঁর শরীরে লাগে।
সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“কারণ এটি তার প্রতিপালকের কাছ থেকে সদ্য আগত।”
(সহিহ মুসলিম: ৮৯৮)
আলেমদের মতে, ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা না থাকলে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির পানি শরীরে লাগানো সুন্নত। বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; হাতে কয়েক ফোঁটা পানি নিয়েও এ আমল করা যায়।
দোয়ার সঙ্গে আমলও জরুরি
ইসলামে শুধু দোয়া করাই যথেষ্ট নয়। দোয়া কবুলের জন্য হালাল উপার্জন, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বৃষ্টি শুরু হলে বিরক্তি প্রকাশ না করে আল্লাহর প্রশংসা করা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, “اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا” দোয়া পড়া এবং নিজের, পরিবারের ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দোয়া করা একজন মুমিনের উত্তম আমল।
বৃষ্টি মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত ও রহমত। তাই প্রতিটি বর্ষণকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে গ্রহণ করে ইবাদত, দোয়া ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে সেই সময়কে কাজে লাগানোই একজন মুসলমানের জন্য সর্বোত্তম পথ।