
একজন আইয়ুব বাচ্চুকে উপমহাদেশে ব্যান্ডসংগীতের এক ভিন্ন সত্তা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। বাংলা গানে নিজস্ব উপস্থিতি জানান দেওয়া এক তুখোড় কণ্ঠ। গিটারিস্ট হিসেবে ধারণা করা হয়, তিনি সম্ভবত বিশ্বমাপেরই একজন। তথাপি তিনি যখন গাইলেন ‘আম্মাজান, আম্মাজান আপনি বড় মেহেরবান’, তখন ব্যান্ডসংগীত অনুরাগীরা হইচই ফেলে দিল। ‘সব গেল’ ‘সব গেল’ বলে রব তুলে দিল। একজন আইয়ুব বাচ্চু কেন এসব ‘আম্মাজান’ গান গাইবেন? আইয়ুব বাচ্চু যেন কানে তুলো দিয়ে কাজ করে গেলেন আপনমনে। কেননা তিনি জানতেন ‘কাজ নিয়েই তো হইচই, বসে থাকা নিয়ে তো আর কেউ কথা বলছে না। তা ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রের গানের শ্রোতারাই গান বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন।’ তার কথার প্রমাণ পাওয়া যায় পরবর্তীতে রকস্টার জেমসের গাওয়া চলচ্চিত্রের গান সর্বজনীন হয়ে ওঠার মাধ্যমে। আইয়ুব বাচ্চু এখনও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি শ্রোতা বিভাজনে বিশ্বাসী ছিলেন না। গান করে গেছেন সব রকমের শ্রোতার জন্যই।
নব্বই দশকে বিটিভি খুলতেই সামনে বসে থাকা তারুণ্য নড়েচড়ে উঠত লাস্যময়ী শাবনূরের সেই বিজ্ঞাপনে, যার জিঙ্গেল ছিল ‘আনে রূপের চমক, তিব্বত বিউটি কেয়ার সোপ’। গেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। যতগুলো বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে তিনি কণ্ঠ দিয়েছিলেন, সে সবই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিল। একজন আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে থাকার জন্য, প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য এসব কর্মও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আরমিউজিক নামে আইয়ুব বাচ্চুর এক টেলিভিশন অনুষ্ঠান এখন পর্যন্ত মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির এক সফল আর্কাইভ, যেখানে আজম খান থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের অনেক সংগীত মুখের মেলবন্ধন ঘটেছে। আইয়ুব বাচ্চু কথার ফাঁকে ফাঁকে উপস্থিত শিল্পীর সঙ্গে নিজে বাজিয়েছেন, গান করেছেন, কখনও ফোনালাপে সরাসরি সতীর্থ কাউকে টেলিভিশন সেটে ডেকে নিয়ে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটিয়েছেন, যা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অনন্য সৌন্দর্য হয়ে আছে।
বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত ও শিল্পীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো সংকটে তিনি বামবার সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য ভীষণ অনুকরণীয়।
সংগীতভিত্তিক রিয়েলিটি শো ‘বাংলাদেশী আইডল’-এ প্রধান চার বিচারকের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এ অনুষ্ঠানে দেশের নতুন ও উদীয়মান শিল্পীরা অংশ নেন। বিচারক হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুর উপস্থিতি প্রতিযোগীদের রক ও আধুনিক গান পরিবেশনে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
চলচ্চিত্রের গানে আইয়ুব বাচ্চুর আগমন ঘটে প্রবল প্লাবনের মতো। যেন প্রচলিত ধারাকে তিনি ভেঙেচুরে দেন। কিনবদন্তি সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে তিনি প্রথমে প্লেব্যাক শুরু করেন। লুটতরাজ সিনেমায় তার গাওয়া ‘অনন্ত প্রেম’ গানের মাধ্যমে সারাদেশ তোলপাড় করে দেন। একই সুরকারের কণ্ঠে ‘আম্মাজান’ গানটি গেয়ে আইয়ুব বাচ্চু এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্লেলিস্টের শুরুতে জায়গা করে নেন। পাশাপাশি উপমহাদেশের সুরের সম্রাট খ্যাত আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘সাগরিকা’ গানটি গেয়েও তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে তার জায়গা পাকাপোক্ত করে নেন। চলচ্চিত্রের গানে আইয়ুব বাচ্চু- বিষয়টি তার ব্যান্ডের গানের শ্রোতাদের একাংশ খুব ভালোভাবে নেয়নি। যদিও ব্যাচেলর কিংবা টেলিভিশন চলচ্চিত্রের গানে তার নিজের সংগীত পরিচালনার কাজ সমালোচকদের মুখও বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে যুগ পেরোনোর পরও তার সেসব গান সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণ প্রিয় হয়ে থাকার কারণে এটাই প্রমাণিত হয়, ভার্সেটাইল গায়ক হিসেবে স্থায়িত্ব পেতে তার সিদ্ধান্ত কিছুতেই অযৌক্তিক কিংবা ভুল ছিল না।
এত কথা আগেভাগে কেন লিখলাম? কেননা, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন সংগীতের প্রকৃত সব্যসাচী। সংগীতের মহাকালের দেয়ালে যার নাম চিরকাল স্পষ্টভাবে জ্বলজ্বলে থাকবে, তা তিনি যেন নিজেই তার বিচিত্র সৃজনশীল কর্মে খোদাই করে গেছেন।
একজন আইয়ুব বাচ্চু যে দীর্ঘ পথের পথিক, সেই ধ্রুব সত্যের প্রথম টোকা লাগে সোলস-এর সঙ্গে তার যুক্ত থেকে অবিস্মরণীয় কিছু কাজের মাধ্যমে। এক দশকে সোলস ও আইয়ুব বাচ্চু যা দিয়ে গেছেন, বাংলা গানের ইতিহাসে তা চিরকাল প্রাসঙ্গিক থাকবে। সে সময়েই তিনি তার একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন। ‘রক্তগোলাপ’ কিংবা ‘ময়না’ দুটি একক অ্যালবামেই আইয়ুব বাচ্চু অনন্য ব্যতিক্রমী সুরের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
তার পরই আসে আইয়ুব বাচ্চু নামে মূল অধ্যায়। নব্বই দশক শুরুই হয় আইয়ুব বাচ্চুর ব্যান্ড এলআরবি ঝড়ের মাধ্যমে। উপমহাদেশের বাংলা গানের সমস্ত হিসাবনিকাশ পাল্টে যেতে শুরু করে এলআরবির একের পর এক অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম ‘এলআরবি-১’ ও ‘এলআরবি-২’ মাধবী ও হকার নামে রীতিমতো ইতিহাস তৈরি করে দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় আসে ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘স্বপ্ন’ এবং আরও সব উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম।
নব্বই দশকে প্রিন্স মাহমুদ ও জুয়েল-বাবু, শওকাতের সুরারোপে আসে নতুন করে ইতিহাস লেখার একেকটা মিশ্র অ্যালবাম। সে সময়েই চাঙ্গা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি। বানিজ্যিক সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশের ব্যান্ড ও ব্যান্ডের ভোকালের বিভিন্ন গান। আইয়ুব বাচ্চু সেসব অ্যালবামে ছিলেন প্রথম তিনের এক, প্রথম দুইয়ের এক কিংবা কখনও একাই একশ।
মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চু এক মহারাজার নাম। মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চু সুরের এক অবিসংবাদী সম্রাট। তার গিটারের ঝড়ে উন্মাতাল হয়ে যেতেন দর্শক-শ্রোতা। বাংলাদেশের আনাচকানাচ থেকে ভারতবর্ষের নানা জায়গার মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন জ্বলজ্যান্ত এক তুফানের নাম। তার গিটারে বুঁদ হওয়ার সেই উজ্জ্বল মুহূর্ত মনে করে এখনও অগণন শ্রোতা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত থাকেন।
বাংলা সংগীতের নানা পথে তুমুল অবদান রেখে যাওয়া কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। বেঁচে থাকতে তিনি এই পদক স্পর্শ করে যেতে পারেননি। অতীব বেদনার বিষয়, চলচ্চিত্রের গানে বিপুল জনপ্রিয় হওয়ার পরও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের দেখা পাননি, যে অসম্ভব বিস্ময়ে এখনও মন খারাপে চুপ করে থাকেন তার অগণন শ্রোতা। একজন আইয়ুব বাচ্চু সাধারণ কেউ তো নন। সংগীতের অসামান্য নাম আইয়ুব বাচ্চু- এ কথা ভাবতে হবে রাষ্ট্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সবারই।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি চলে গেছেন। এত দ্রুত, এমন অবেলায় তার চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি ভক্তকুল। আরও কিছুদিন তিনি যদি থাকতেন! এমন আফসোসে আড়ষ্ট অনেকের কণ্ঠই। তিনি জন্মেছিলেন চট্টগ্রামে। ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট। যারা তাকে ভালোবাসেন, তারা জানেন তিনি বেঁচে আছেন। তার কর্ম, তার কীর্তি তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ১৬ আগস্ট তার জন্মদিনে তাই গানপ্রেমীদের কাছে বিশেষ দিন। এমন দিনে পৃথিবীতে একজন আইয়ুব বাচ্চু জন্মেছিলেন।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে আমাদের প্রার্থনা, তিনি রূপালি গিটার ফেলে দূরে চলে গেলেও তাকে আমরা মনে রাখব।