
শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা টলুইনযুক্ত সস্তা আঠাই এখন এক মারণ নেশায় পরিণত হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যা ‘ড্যান্ডি’ নামে পরিচিত। সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটলে এই আঠা পলিথিন বা অন্য কিছুতে ভরে টানতে দেখা যায় নানা বয়সী ছিন্নমূল নারী ও শিশু।
‘ড্যান্ডি’ নেশায় বুঁদ হওয়াদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কের পাশে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে এই মাদক গ্রহণের চিত্র দেখা যায়। দিন দিন এই সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল নারী ও শিশুরা এই ড্যান্ডিতে আসক্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
রাজধানীর ফার্মগেট, সদরঘাট, আহসান মঞ্জিল, কারওয়ান বাজার এবং কমলাপুর এলাকার ফুটপাত বা জনাকীর্ণ স্থানে পলিথিন কিংবা বোতলে করে এই আঠার বাষ্প টানতে দেখা যাচ্ছে নানা বয়সী নারীদেরও। এদের প্রায় সবাই ছিন্নমূল এবং বর্জ্য বা ভাঙারি কুড়িয়ে জীবনযাপন করেন।
ফার্মগেট এলাকায় ৭-৮ মাসের সন্তানসম্ভবা ২০ বছর বয়সী এক নারী পলিথিনে মুখ গুঁজে ড্যান্ডি টানছিলেন। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে এবং সৎ মায়ের নির্যাতনে রংপুর থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসা এই নারী প্রায় আট বছর ধরে এই নেশায় আসক্ত। শত চেষ্টা করেও তিনি এই আসক্তি কাটাতে পারছেন না।
সদরঘাটে দুই সন্তানসহ ভিক্ষুক ২৬ বছর বয়সী আরেক নারী ছয় মাসের সন্তান হারানোর শোকে ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে এখন যেন এটিই তার সঙ্গী। এছাড়া ফার্মগেটের কমলাপুরের বিভিন্ন স্পটেও একাধিক তরুণী ও নারীকে এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে দেখা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, ড্যান্ডি মূলত টলুইনভিত্তিক এক ধরনের আঠা, যা জুতা, চামড়াজাত পণ্য ও আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মাত্র ২৫ থেকে ৬০ টাকায় এই নেশা করা যায়।
হার্ডওয়্যার বা জুতা মেরামতের দোকানে লাইসেন্স ছাড়াই এটি অবাধে বিক্রি হওয়ায় পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের নাগালে এটি খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। ক্ষুধা, ক্লান্তি ও মানসিক কষ্ট সাময়িকভাবে ভুলতে তারা এই পথ বেছে নেয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের মতে, টলুইন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি নিউরোটক্সিক উপাদান, যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পেশির দুর্বলতা, অসাড়তা, কাঁপুনি, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পাশাপাশি লিভার ও কিডনি ধ্বংস হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় এটি ‘সাডেন স্নিফিং ডেথ সিনড্রোম’ বা আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ড্যান্ডির বাষ্প গ্রহণে রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপোক্সিয়া) দেখা দেয়। এর প্রভাবে আকস্মিক গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, অকাল প্রসব এবং নবজাতকের কম ওজন কিংবা জন্মগত শারীরিক-মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।
হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীরা নামমাত্র কড়াকড়ি করলেও খুচরা বিক্রি বন্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় এটি থামানো যাচ্ছে না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ক্রেতার লাইসেন্স ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য যাচাইয়ের মতো কঠোর নীতিমালা চালুর কথা ভাবলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি।
সরকারি কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে সংস্কারকাজের কারণে বর্তমানে নারীদের জন্য নির্ধারিত শয্যাসংখ্যা অপ্রতুল। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের অভাবে এই আসক্তির বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।