leadingnews.net
সর্বশেষ :
leadingnews.net এ আপনাকে স্বাগতম।।। নিত্য নতুন খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথে থাকুন।।। ধন্যবাদ।।।

সুরক্ষার দুর্গেই নরকবাস

  • আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার পঠিত

পরিবার, সমাজ কিংবা আইনের জটিলতায় পড়ে যেসব কিশোরী শেষ আশ্রয় হিসেবে রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয় কিংবা আদালতের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে শিশু সংশোধনাগারে আশ্রয় পায়, তাদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে কাজ করে গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালিকা)। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে শতাধিক কিশোরী অবস্থান করছে। তবে আইনের সুরক্ষায় থাকা অসহায় কিশোরীদের ভুলত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে তাদের নতুন জীবন দিতে কাজ করে যে প্রতিষ্ঠান, তার ভেতরেই শিশুদের যৌন নির্যাতনের ভয়ংকর অভিযোগ সামনে এসেছে। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালিকা) সদ্য প্রত্যাহার হওয়া তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালক মো. সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধেই উঠেছে এমন অভিযোগ। একজন বা দুজন নয়, তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সংশোধনাগারে বসবাস করা প্রায় সব কিশোরীরই। অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির নারী কর্মী ও নিবাসী কিশোরীদের যৌন হয়রানি, অশালীন প্রশ্ন, স্পর্শকাতর অঙ্গে ‘ব্যাড টাচ’, সন্ধ্যার পরে একান্তে কক্ষে ডেকে নেওয়া, যৌন উত্তেজক ভিডিও দেখতে বাধ্য করা, অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব, অভিভাবকদের কাছ থেকে বিকাশে অর্থ আদায়, গর্ভপাতে অর্থ লেনদেনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অফিস শেষ হওয়ার পর নিজের পছন্দ অনুযায়ী কিশোরীদের আলাদা করে নিজের কক্ষে ডেকে নিতেন কেন্দ্রটির সদ্য সাবেক তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক) মো. সেতারুজ্জামান। সেখানে তাদের ব্যক্তিগত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করতেন, শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতেন, কখনো জড়িয়ে ধরতেন। এসবের প্রতিবাদ করলে অপমান, ভয়ভীতি এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো কিশোরীদের। সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ তদন্তে অসংখ্য নিবাসী কিশোরীকে এভাবে যৌন হয়রানির প্রমাণ মিলেছে। সেখানে কর্মরত সোশ্যাল কেস ওয়ার্কার, কাউন্সেলর, নার্স, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, আনসার সদস্য, বাবুর্চি ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ উঠে আসে। শুধু যৌন নির্যাতনই নয়, সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিশোরীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ নানাভাবে হয়রানির প্রমাণও মেলে। তদন্তে গিয়ে খোদ তদন্ত কর্মকর্তাও ‘বডি শেমিংয়ের’ শিকার হন। এ ছাড়াও আদালত থেকে জামিন হওয়ার পরও এক কিশোরীকে টাকার জন্য অতিরিক্ত ১০ দিন আটকে রাখার তথ্য মেলে তত্ত্বাবধায়ক সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে। আরেক নিবাসীর মায়ের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, নিয়ম ভেঙে কিশোরীদের সঙ্গে পরিবারের সাক্ষাৎ—এমনকি টাকার বিনিময়ে কিশোরীদের গর্ভপাত করানোর মতো গুরুতর অপরাধেরও প্রমাণ পায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি। তদন্ত শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন যুগ্মসচিব তার পর্যবেক্ষণে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে অভিযুক্ত তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেন। কিন্তু তদন্তে এত গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান শুরু করে কালবেলা। অনুসন্ধানের স্বার্থে গত ২ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন দিন গাজীপুরে অবস্থান করে বিভিন্ন কৌশলে সেখানে কথা বলা হয় প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে। যার রেকর্ড কালবেলার কাছে সংগৃহীত রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধায়ক সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগের সত্যতা মেলে। অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু নিবাসী কিশোরীরাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির এক নারী কর্মীও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি এই নির্যাতনের জেরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে এক কিশোরী আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিল বলেও তথ্য মিলেছে।

যেভাবে শুরু: জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে কয়েকজন নিবাসী কিশোরী প্রথমে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে। পরে সাহস করে তারা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানায়। অভিযোগের পর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক কেন্দ্রে গিয়ে কয়েকজন নিবাসীর সঙ্গে কথা বলেন। পরে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে অভিযোগকারী নিবাসীদের পরিচয় সেতারুজ্জামানের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়। এতে সেতারুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে নিবাসীদের ওপর আরও চড়াও হন। গত বছরের ৩০ অক্টোবর সমাবেশ ডেকে তিনি নিবাসীদের হুমকি-ধমকি দেন। এতে ক্ষিপ্ত নিবাসীদের কয়েকজন সমাবেশ শেষে সেতারুজ্জামানের কক্ষে হামলা-ভাঙচুর করে। এ সময় অন্য কর্মচারীরা সেখান থেকে সেতারুজ্জামানকে উদ্ধার করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আয়শা আক্তারের নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা কিশোরীদের বক্তব্য আলাদাভাবে নেন, যাতে তারা নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে পৃথকভাবে প্রত্যেকের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য সংযুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে একাধিক কিশোরীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, তত্ত্বাবধায়ক তাদের একান্তে ডেকে ব্যক্তিগত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করতেন। একজন কিশোরী অভিযোগ করেছে, তাকে বিয়ের প্রথম রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে নানা কৌশলে কথা বলানোর চেষ্টা করা হতো। আরেক কিশোরীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে, তারপর ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে এমন একাধিক বক্তব্য রয়েছে, যেখানে কিশোরীরা বলেছে—এসব প্রশ্নে তারা বিব্রত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ত, কিন্তু কর্তৃপক্ষের ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারত না।

এ ছাড়া তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অফিস সময় শেষ হওয়ার পর কিংবা ছুটির দিনে তত্ত্বাবধায়ক একা একা নিবাসী কিশোরীদের নিজের কক্ষে ডাকতেন। অনেক কিশোরী তাদের বক্তব্যে বলেছে, আনসার সদস্য, নারী কর্মী কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে তাদের ডেকে নেওয়া হতো। কক্ষে ঢোকার পর অনেক সময় বাইরে থাকা কর্মচারীকে সরে যেতে বলা হতো। পরে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যক্তিগত আলাপ, অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব, ৫ মিনিটের জন্য তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে বাথরুমে যাওয়ার প্রস্তাব, অশালীন প্রশ্ন কিংবা শারীরিক স্পর্শের অভিযোগ করেছে তারা। তদন্তে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীও স্বীকার করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক নিয়ম ভেঙে অফিস-পরবর্তী সময়ে নিবাসীদের একা নিজের কক্ষে ডাকতেন। অথচ শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনার প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, কোনো নিবাসীর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে হলে সংশ্লিষ্ট কেস ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

‘ব্যাড টাচ’ ও শরীরে হাত দেওয়ার অভিযোগ: তদন্ত প্রতিবেদনে একাধিক কিশোরী অভিযোগ করেছে, কক্ষে ডেকে নেওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করতেন। কেউ বলেছেন, হাত ধরে টানতেন; কেউ বলেছেন, বুকে হাত দিয়েছেন; আবার কেউ অভিযোগ করেছেন, জড়িয়ে ধরতেন বা ধরার চেষ্টা করেছেন। এক কিশোরীর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তিনি তাকে প্রায় এক ঘণ্টা নিজের কক্ষে বসিয়ে রাখেন। অন্য একজন বলেছেন, তাকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট কক্ষে রেখে বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেন এবং শরীরে হাত দেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, এসব আচরণের কারণে অনেক কিশোরী তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যেতে ভয় পেত। কেউ কেউ অসুস্থতার অজুহাত দিত, আবার কেউ অন্য নিবাসীকে সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করত। কয়েকজন কিশোরীর বক্তব্যে বলা হয়েছে, তারা প্রথমে অভিযোগ জানাতে ভয় পেত। কারণ অভিযোগ করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে—এমন আশঙ্কা ছিল। পরে যখন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়, তখনো তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর একপর্যায়ে নিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সমাবেশে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা হলে কয়েকজন কিশোরী তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্য কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ করতে হয়।

সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ: সমাজসেবা অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিবের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালিকা) তত্ত্বাবধায়ক মো. সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো একের পর এক অভিযোগ। তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে তিনি এমন একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে নিবাসী কিশোরী থেকে শুরু করে নারী কর্মচারী—প্রায় সবাই এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতেন। তদন্ত প্রতিবেদনে একাধিক নিবাসীর বক্তব্যে এসেছে, তত্ত্বাবধায়ক বিভিন্ন অজুহাতে তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে টাকা আনতে বলতেন। কেউ বলেছেন, চিকিৎসার কথা বলে টাকা চাওয়া হতো; কেউ বলেছেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে টাকা লাগবে বলে বিকাশ নম্বর দেওয়া হতো। কয়েকজন নিবাসী অভিযোগ করেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি তত্ত্বাবধায়কের বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়েছেন। শুধু নিবাসীদের বক্তব্য নয়, কয়েকজন কর্মচারীর সাক্ষ্যেও এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।

এক শিশুর কেস হিস্ট্রি আরেক শিশুর কাছে, শুরু হয় বুলিং: তদন্ত প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—নিবাসীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়নি। কয়েকজন কিশোরী অভিযোগ করেছে, তাদের ব্যক্তিগত কেস হিস্ট্রি, পারিবারিক সমস্যা কিংবা আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অন্য নিবাসীদের সামনে বলা হতো। এতে সংশ্লিষ্ট কিশোরীরা পরে অন্যদের কটূক্তি ও বুলিংয়ের শিকার হতো। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের আচরণ শিশু সুরক্ষা নীতির পরিপন্থি এবং নিবাসীদের মানসিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর।

শুধু নিবাসী কিশোরীরাই নয়, তদন্তে প্রতিষ্ঠানের নার্স ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরাও তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনের বাইরে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা, বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মন্তব্য করা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজের কক্ষে ডাকা এবং আপত্তিকর মন্তব্য করার ঘটনা ঘটত। এক নারী কর্মচারী বলেছেন, এসব আচরণের কারণে তিনি তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে একা যেতে অস্বস্তি বোধ করতেন। আরেকজন জানিয়েছেন, প্রতিবাদ করায় তাকে অপমানজনক ভাষায় কথা শোনানো হয়।

ভয়ভীতি ও মানসিক চাপে আত্মহত্যার চেষ্টা: এক নিবাসী মানসিক চাপে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল বলেও প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ভয় এবং প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে হতাশা থেকে ওই কিশোরী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তদন্তকারী ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে নিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।

তদন্তে গিয়ে কর্মকর্তাও ‘বডি শেমিং’-এর শিকার: তদন্ত চলাকালে উপস্থিত প্রশাসন ক্যাডারের একজন নারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার শারীরিক গঠন নিয়েও অশোভন মন্তব্য করা হয়েছিল বলে সাক্ষ্যে উঠে এসেছে। নিবাসীরা বলেছেন, সেতারুজ্জামান তাদের ডেকে একদিন বলেন, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে কথা বলতে আসবেন। এ সময় নিবাসীরা সেতারুজ্জামানের কাছে জানতে চান তিনি বিবাহিত কি না। তখন সেতারুজ্জামান নিবাসীদের বলেন, শুধু বিবাহিতই নয়। উনি চার-পাঁচ বাচ্চার মা। এরপর আরও বাজে ভাষায় বডি শেমিং করেন যা প্রকাশযোগ্য নয়। তদন্তে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে এবং কর্মস্থলের পরিবেশের সঙ্গে এমন আচরণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে।

১৫টি অভিযোগের সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি: ১৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে কমিটি অন্তত ১৫টি গুরুতর অনিয়ম ও অসদাচরণের সত্যতা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নিবাসীদের একা কক্ষে ডাকা; যৌন হয়রানিমূলক আচরণ; ব্যাড টাচ; অশ্লীল ভাষা ব্যবহার; কেস হিস্ট্রি ফাঁস করা; কেস ওয়ার্কারদের বাদ দিয়ে মেয়েদের রুমে ডাকা; অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া; খাবার ও সাক্ষাৎ সংক্রান্ত অনিয়ম; শিশু সুরক্ষা নীতিমালা লঙ্ঘন; নিবাসীদের মানসিক নির্যাতন; নার্স ও নারী কর্মকর্তাদের হয়রানি; বডি শেমিং; অফিস সময়ের পর নিয়মবহির্ভূত যোগাযোগ; আনসার সদস্যদের অপব্যবহার; প্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি। এরপর অভিযোগের সত্যতা পেয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভাগীয় ঢাকা কার্যালয়ের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আয়শা আক্তার তার তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—অভিযুক্ত তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; বালিকা প্রতিষ্ঠানে নারী তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ; কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা; শিশু সুরক্ষা নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা ও শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনার নীতিমালা সংস্কার।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের এত গুরুতর অভিযোগ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের পরও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। বরং সেতারুজ্জামান মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তিগত শুনানির জন্য আবেদন করেন। এরপর তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গত ১ জুলাই একটি ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেই শুনানির রেফারেন্স দিয়ে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুনরায় সেই একই পদে বহাল করা হয়। গত ২৭ জুলাই রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করা হয় সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় ঢাকার পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আয়শা আক্তারের সঙ্গে। তিনি প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, আমরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাকে অব্যাহতি দিয়েছি। এটা নিয়ে আর কী বলব? এরপর তাকে তদন্তের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আমি যে রিপোর্ট দিয়েছি তার চেয়ে সেল্ফ এক্সপ্লানেশন প্রতিবেদন আর কী হতে পারে। তার পরও তারা তাকে দায়মুক্তি দিয়েছে।’ মন্ত্রণালয়ের তদন্তের বিষয়ে বলেন, ‘ওটা কোনো তদন্তই হয় নাই। একজন ভয়ংকর অপরাধীকে মুক্তি দেওয়ার জন্য যা যা করা যায়, তাই করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না। আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের একজন নারী কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘যদি একই ব্যক্তিকে আবার দায়িত্বে আনা হয়, তাহলে আমাদের আর কিছু বলার থাকে না। এত অভিযোগ ওঠার পরও যদি তিনি ফিরে আসেন, তাহলে আমাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে। তবে সিদ্ধান্ত তো বিভাগই নেবে। তারা বড় কর্তা।’

আরও একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা যখন সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি, তখন উল্টো আমাদের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে তালিকা পাঠিয়ে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। আমাদের ধর্মীয় শিক্ষক ও ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরের মতো সৎ কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে। অথচ তারা অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।’

জানতে চাইলে দীর্ঘদিন ধরে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালিকা) চাকরি করেন এমন একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মেয়েদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ ছিল। মেয়েদের ‘ব্যাড টাচ’ করতেন বলে অভিযোগ ওঠার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এখন আবার তাকে একই দায়িত্বে পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কয়েকজন মেয়ে লিখিত অভিযোগও দিয়েছিল। অধিদপ্তর থেকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা এসেছিল। কিন্তু তদন্ত কীভাবে হলো, কোথায় হলো, কারা করল—এগুলোর কিছুই আমরা জানি না। আমাদের অফিসে কোনো তদন্ত কমিটি আসেনি। এমনকি যেসব নার্স বিষয়গুলো জানতেন, তাদেরও ডাকা হয়নি। তাহলে কীভাবে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলেন, সেটাই প্রশ্ন।

জানতে চাইলে আর একজন কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা এখানে না এসে, ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য না নিয়ে তারা কীভাবে তদন্ত করল সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অনেক মেয়েকে দ্রুত অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। আমার ধারণা, তদন্ত এলে যাতে তারা সাক্ষ্য দিতে না পারে, সে কারণেই তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারণ একজনকে সিলেট, আরেকজনকে বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়।

জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব কালবেলাকে বলেন, ‘আসলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তো মন্ত্রণালয়ের। আমাদের প্রসিডিউর যেটা আমরা তদন্ত করে বিস্তারিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যেটা বলেছেন ওখানে পুনরায় উনাকে (সেতারুজ্জামান) পুনর্বহাল করায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিবাসীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। তাই আমরা তাকে আবার অধিদপ্তরে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি।’

বিস্তারিত জানতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফকে একাধিকবার ফোন দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. কামাল উদ্দিন বিশ্বাসকে ফোন দেওয়া হলে তিনি সব প্রশ্ন শুনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে কথা বলতে সেতারুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কেটে দেন। এরপর প্রশ্ন লিখে মেসেজ আকারে পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© 2025 | Leading Media & Communication ltd এর এক‌টি প্রতিষ্ঠান।
Design & Development By HosterCube Ltd.