সংশোধিত আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএনসিকে অস্ত্র বহনের ক্ষমতাসহ মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে একচ্ছত্র আধিপত্য দেওয়া হয়েছে। আইনের ৩৬-এর ক ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স কেনাবেচা, সরবরাহ, প্রস্তাব, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা, যোগাযোগ অথবা এ-সংক্রান্ত কোনো অবৈধ কার্যক্রম করেন বা করার চেষ্টা করেন; তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ৩৬-এর খ ধারায় বলা হয়েছে, একই উদ্দেশ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করলে বা করার চেষ্টা করলে তা অপরাধ। এই অপরাধের ক্ষেত্রে সঙ্গে মাদকদ্রব্য না পেলেও শুধু ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির এই যুগে অ্যাকাউন্ট হ্যাক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে যে কারও নামে চ্যাট এবং ভয়েস ক্লোন করা সম্ভব। কারও অজান্তে তার মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে টাকা পাঠিয়ে বা শত্রুতা করে চ্যাটবক্সে ফাঁদে ফেলে কাউকে অপরাধী সাজানোর সুযোগ থাকছে। আবার মাদক কারবারিরা মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসে যোগাযোগ করলেও সাধারণত সাংকেতিক ভাষায় কথা বলেন। ক্রেতা হয়তো বললেন, ‘তিন প্যাকেট দেন।’ এর মাধ্যমে তিনি প্যাকেটে থাকা ৩০০ পিস ইয়াবা চাইলেন। বিক্রেতা বললেন, ‘আচ্ছা ৬০ পাঠিয়ে দেন।’ অর্থাৎ, তিনি ৬০ হাজার টাকা দাম চাইলেন। ডিএনসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিষয়টি ধরতে পেরে তাকে আটক করলেন। কিন্তু এই সাংকেতিক কথোপকথন আদালতে প্রমাণ করা শক্ত হতে পারে। তখন গ্রেপ্তার ব্যক্তি হয়তো বললেন, তিনি তো আমার কাছে তিন প্যাকেট ন্যাপথলিন চেয়েছেন। সেই বাবদ আমি ৬০ টাকা চেয়েছি। আবার উল্টোটাও হতে পারে যে, সত্যিই কেউ ন্যাপথলিনই কিনেছেন, কিন্তু মাদক সন্দেহে ফেঁসে যেতে পারেন।
ডিএনসির অভিযানিক কার্যক্রমে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তারা এ সমস্যা স্বীকার করে বলেন, কথোপকথনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। এ জন্য আইন প্রয়োগে যুক্ত সবার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দরকার।
আইনের ৩৫-এর ‘ক’ ধারায় মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা ও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাল আমলের প্রযুক্তিনির্ভর মাদক কারবার ঠেকাতে এই উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া দরকার ছিল। এখন আইন হলেও ল্যাব স্থাপন করে এর সুফল পেতে দেড় থেকে দুই বছর লেগে যাবে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডার্ক ওয়েব (ইন্টারনেটের একটি গোপন অংশ) ব্যবহার করে মাদকের কেনাবেচা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন সম্পর্কে আগে থেকে জানার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত দেশে অন্তত তিনটি এমন ঘটনা শনাক্ত করতে পেরেছে ডিএনসি। তবে সে ক্ষেত্রে প্রথমে মাদক জব্দ ও কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তদন্তে ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির বিষয়টি বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ, সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা ও ফরেনসিক ল্যাব হলেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক কারবার ঠেকানো সহজ হবে না।
অবশ্য ডিএনসির দায়িত্বশীলরা বলছেন, সন্দেহভাজনদের ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা ও সাইবার স্পেসে তাদের পদচারণা বিশ্লেষণ করে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে মাদক কারবার ঠেকানো যাবে। আবার নিবিড়ভাবে ‘ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওএসআইএনটি)’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাদক লেনদেনের আগাম তথ্য পাওয়া সম্ভব।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক-সংক্রান্ত মামলার ৪০ ভাগই ভুয়া। নানাভাবে মাদক দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। আবার আসামি গ্রেপ্তারের পর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রমাণ সংগ্রহ-সংরক্ষণ করা হয় না, সাক্ষী পাওয়া যায় না। এতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ছাড়া পেয়ে যান। তারা আবারও একই অপরাধে জড়ান।