সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন থানায় হওয়া হত্যা মামলার মধ্যে পিবিআইয়ে তদন্তাধীন ৩২৮টি। এক বছর থেকে ১০ বছরের বেশি সময়ের হত্যাকাণ্ড এগুলো। এর মধ্যে ২৩টি মামলা কোনো আসামির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের তদন্ত স্থগিতাদেশ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু হত্যা মামলার তদন্ত করতে বেশি সময় লাগার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক মামলায় আলামত জব্দের ঘাটতি থাকে। কোনো কোনো হত্যাকাণ্ডের সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। বারবার কর্মকর্তা বদল হওয়ায় তদন্তের ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটে। নতুন কর্মকর্তাকে তদন্ত শুরু করতে হয় প্রথম থেকে। সাক্ষীও পাওয়া যায় না ঠিকমতো। ঘটনাস্থলের অবকাঠামো পরিবর্তন হয়ে যায়। কোনো ক্ষেত্রে ফরেনসিক এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতেও সময় লাগে। তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতিও রয়েছে।
স্কুলছাত্রী তাসনিম রহমান করবীর বাবা আইনজীবী মিজানুর রহমান জানান, মামলাটি থানা পুলিশ ঘুরে সিআইডিতে তদন্তাধীন ছিল। তাঁর মেয়ের হত্যারহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করতে না পেরে সিআইডি আদালতের মাধ্যমে মামলাটির তদন্ত স্থগিত করে রেখেছে। তিনিও এ ব্যাপারে আদালতে নারাজি দেননি। কারণ হিসেবে তিনি সমকালকে বলেন, কম তো হলো না। বাসায় মেয়ে খুন হলো আর পুলিশ তা বছরের পর বছর তদন্ত করেও বের করতে পারল না। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা এসে ডাকে, জিজ্ঞাসা করে। আর কত! মানুষের অপেক্ষারও তো শেষ থাকে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. আবু ইউছুফ বলেন, অনেক হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু থাকে না। এসব ক্লুলেস মামলা উদ্ঘাটন করার আশায় বিভিন্ন সময় তদন্তকারী পরিবর্তন করতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বাদীপক্ষের নারাজির পরিপ্রেক্ষিতেও তদন্তে সময় লাগে।
তিনি আরও বলেন, প্রধান আসামির বিদেশে পালানো বা ছদ্মবেশে আত্মগোপনে থাকা এবং উচ্চ আদালতের আদেশে কিছু মামলার তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত থাকা দীর্ঘ বিলম্বের অন্যতম কারণ। তাছাড়া সব আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার কারণে মামলা নিষ্পত্তি করতে সময় লাগে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন বলেন, মামলা দীর্ঘদিন চলার পেছনে শুধু তদন্ত নয়; সাক্ষীর অনুপস্থিতি, আসামি পলাতক থাকা, আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষার সময়, একাধিক আসামি-সাক্ষী, বিচারিক প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড
১৪ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। থানা, ডিবি, র্যাবের পর জোড়া খুনের মামলাটি এখন তদন্ত করছে পিবিআই। তদন্তে এখনও সন্তোষজনক কিছু নেই। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন এই সাংবাদিক দম্পতি। ১৪ বছরে হত্যাকারীদের শনাক্তই করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাড়ে চার বছরেও মানসুরা হত্যারহস্য অজানা
২০২২ সালের ২৮ জানুয়ারি নরসিংদী শহরের সাটিরপাড়ার বাসায় গৃহবধূ মানসুরা আক্তার ইতিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। চার বছরের মেয়েসহ স্বামী মশিউর রহমানের হিমেলের সঙ্গে তিনি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ঘটনার দিন তাঁর স্বামী গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে পরদিন নরসিংদী সদর থানায় মামলা করা হয়। সাড়ে চার বছরেও হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
ন্যায়বিচারের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, অপরাধের ধরন, হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে জটিলতা কিংবা তদন্তের বিষয়বস্তুর অস্পষ্টতার কারণে বহু হত্যা মামলা তদন্তাধীন থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হত্যায় জড়িত ব্যক্তি, নির্দেশদাতা কিংবা সুবিধাভোগীদের গ্রেপ্তার করা না গেলে ন্যায়বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। একসময় হত্যার আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলে তদন্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।