
মোঃজাহাঙ্গীর কবির শরীফ
গত বেশ কয়েকদিন যাবত একটি কৃত্রিম জীবন অতিবাহিত করছি। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের সকলের প্রিয় বীর শহীদ ওসমান বিন হাদী ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়া অতঃপর আল্লাহর ডাকে শহীদ হিসেবে সাড়া দেওয়ার পর অনেকটা আবেগের তাড়নায় বাস্তবতার নিরিখে মন খুলে হৃদয়ের গহীন থেকে কিছু কথা ব্যক্ত করতে ইচ্ছে করছে।
ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য অনলাইন প্লাটফর্মের কল্যাণে বিগত কয়েকদিন ভাইয়ের স্মৃতিগুলো দেখতে থাকি। দেখে ভাইয়ের সংগ্রামী ও বিপ্লবী চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা সম্বন্ধে আরও অনেক বেশি জানতে পারি।
ভাইয়ের শাহাদাত কিংবা গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে ভাই সম্বন্ধে খুব কমই জানতে পেরেছি। তবে ভাইয়ের খুরদার যুক্তি, জোরালো কণ্ঠস্বর এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও সততার ক্ষেত্রে আপোসহীন বক্তব্য সব সময় অন্যান্য সকলের ন্যায় আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত ও আন্দোলিত করত।
যাই হোক বিশেষ করে ভাইয়ের শাহাদাত বরণ করার পর এই দূর প্রবাসে থেকেও ভাই সম্বন্ধে অনেক বেশি প্রতিনিয়ত অনলাইনে ঘাটাঘাটি করি দেখতে থাকি ও জানতে থাকি। নিজেকেই গত কয়েকদিন কোনভাবেই মানাতে পারছি না । মনে হচ্ছে, এই দূর প্রবাসে না থেকে স্বদেশে ভাই কিংবা ভাইয়ের সহযোদ্ধা ও পরিবার পরিজনের সাথে যদি থাকতে পারতাম, ভাইয়ের জানাজায় শরিক হতে পারতাম; এমনকি সর্বশেষ স্মৃতিগুলো সরাসরি নিজের শরীরে জড়াতে পারতাম, তাহলে অন্তত নিজের জীবনকে কিছুটা হলেও স্বার্থক মনে করতাম। যাক সৃষ্টিকর্তা হয়তো সেই সৌভাগ্য আমার কপালে রাখেনি ।
আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া এই কারণে যে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার এইরকম একজন প্রিয় বান্দাকে আমাদের মাঝে খুব স্বল্প সময়ের জন্য প্রেরণ করে (মাত্র ৩২ বছরের জীবন আমাদের মাঝে উপহার দিয়ে) আমাদেরকে অনেক কিছুই শিখিয়েছেন।
আমাদের বাঙালি জাতিকে কিভাবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ও একতাবদ্ধ হতে হবে হাদী ভাইয়ের বদৌলতে
আমরা তা বুঝতে পেরেছি। এজন্য আল্লাহ পাকের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করছি ।
লেখাটি আমি যে সময়টাতে লিখতে বসেছি সেই সময়টা আমার জন্য অনেক আবেগঘন এবং অস্বাভাবিক একটি সময় । কারণ এখন সৌদিআরবে রাত দুইটা তথা গভীর ঘুমের সময়। কিন্তু কিছুতেই আমার দু চোখে ঘুম আসছে না।
ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী এই বিপ্লবী বীর শহীদ ওসমান দিন হাদি যে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গর্বিত এলামনাই তা আগে থেকেই জানতাম। তবে তিনি যে আমার হলেরই বড় ভাই তা জেনে সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম। তাইতো প্রতিনিয়ত ভাইয়ের সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছে করছিল ।
ফেসবুক এবং ইউটিউবে ভাইয়ের বিভিন্ন ভিডিও দেখতে ইচ্ছে করছিল। ভাইকে নিয়ে বেশ কিছু নিউজ, গান; বিশেষত ভাইয়ের স্বরোচিত কবিতা ও বেশ কিছু সাক্ষাৎকার ও টকশো দেখছিলাম।
এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি টকশো নিজেকে এমন একটি জগতে নিয়ে যায় যে জগতে প্রবেশ করে মনে হলো যে আমি কিংবা আমরা অনেকেই আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে হাদি ভাইয়ের সংক্ষিপ্ত অথচ ইমপ্যাক্টফুল জীবনের তুলনায় তেমন কিছুই করতে পারিনি।
বারবার মনে হচ্ছিল, আমাদের প্রিয় হাদি ভাই তার ছোট্ট জীবনে যা করেছে মনে হয় যেন আমি কিংবা আমাদের অনেকেই উনার মত বেশ কয়েকটি জীবন পেলেও তার এতটুকু ধারে কাছেও যেতে পারব না। ভাই যে এত দূরদর্শী এবং নিঃস্বার্থ; এমনকি দলনিরপেক্ষভাবে দেশকে নিয়ে ভাবতে পারে সেটা সত্যি অনেক বিরল। হাদি ভাইয়ের এমন দেশপ্রেম আমি এখন পর্যন্ত খুব কম লোকের ভিতরে দেখেছি। খুব কম লোক বললে ভুল হবে। আমি এখন পর্যন্ত কারো ভিতরে দেখিনি। প্রত্যেকটা লোকই কোন না কোন দিক থেকে পক্ষপাতদুষ্ট। এমনকি আমি নিজেও।আমি আমার ছাত্র জীবনে অনেক দলের সাথে আমার অংশগ্রহণ, নিজের সমর্থন কিংবা নিজের আবেগ জড়িয়েছে। বিশেষ করে একটা সংগঠন তথা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের নাম না উল্লেখ করলেই নয় । যা আমার জীবনে অনেক বেশি প্রভাব রেখেছে।
আমি মনে করি প্রত্যেকটা ব্যক্তিরই শহীদ ওসমান বিন হাদি ভাইকে নিয়ে গবেষণা করা, তার রেখে যাওয়া স্মৃতিকর্ম গুলোকে স্মরণ ও তা নিয়ে থিসিস করা, আলাপ আলোচনা করা অনেক বেশি প্রয়োজন। কারণ তার জীবনাদর্শ ও চিন্তা চেতনায় যে দূরদর্শিতা লক্ষণীয় ; সত্যিই তা আজকের ভগ্নপ্রায় বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি অনুসরণীয় এবং শিক্ষনীয়।
আমাদের বীর শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী আমাদের পাঠ্যপুস্তক এবং একাডেমিক সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। কেননা এর ফলে পরবর্তী প্রজন্ম তার সম্পর্কে আরো অনেক বেশি জানতে পারবে। তার চিন্তাধারা ও জীবনদর্শন নিয়ে অনেক বেশি ডকুমেন্টারি, শর্ট ফিল্ম ও সিনেমা হওয়া উচিত। কারণ এগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা ভাইয়ের জীবনদর্শন ও স্মৃতিগুলো লালন করতে পারবো। হাদিবাদকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রূপান্তর করতে পারব। হাদি ভাই ও বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবতে এবং লিখতে গিয়ে আজ কিছুতেই চোখে ঘুম আসছে না । বারবার চক্ষু যুগল শুধু অশ্রুসিক্ত হচ্ছে। পরনের গেঞ্জি, মাথার নিচের বালিশ এমন কি গায়ে মোড়ানো কম্বল ও ভিজে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল।
আমার জন্য রাত জাগা বিশেষত রাত একটা-দুইটা পর্যন্ত জেগে থাকা রীতিমতো অসম্ভব একটা ব্যাপার। দেশে থাকতে এমন কি সৌদিতে আসার পরেও আমি এখন পর্যন্ত একদিনও এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারেনি। কিন্তু আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না।
বারবার মন চাইছে আমার মনের গহীনে যে সুপ্তচিন্তার বিকাশ সাধিত হয়েছে, চিন্তার ঘরে যে অগ্নিসুলঙ্গ স্ফুরিত হচ্ছে তা অবশ্যই লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত। নয়ত কোন এক সময় আমার চোখ লেগে গেলে ঘুমের ঘোরে আমি সব হারিয়ে ফেলবো । দেখা যাবে ঘুম থেকে উঠে কিছুই আমার আর মনে থাকবে না। তাই আজ আমি আমার শৃঙ্খলা ভেঙে টাইপ করতে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারিনি । আমার মনের গহীনে জেগে ওঠা এই ভাবাবেগ আমার স্মৃতিপঞ্জিতে যদি লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারি তা সত্যি অনেক বেশি জাগরূক হয়ে থাকবে ।
হাদি ভাইকে নিয়ে তার নিজের এবং অন্যান্যদের মধ্যে সংঘটিত সাক্ষাৎকার, আলোচনা এবং ভিডিওগুলা যত দেখছি ততই স্তম্ভিত হচ্ছি। একটা বান্দাকে আল্লাহ কি পরিমাণ ভালবাসলে এত এত নেয়ামত আর রহমতের চাঁদরে ঢেকে রাখতে পারে।
ভাইয়ের উপর তার বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এমনকি শিক্ষক; সকলের ভালোবাসা এবং পরম মমতা ও দোয়ার উসিলায় আল্লাহ অসীম রহমত এবং নেয়ামত প্রদান করেছেন । শুধু তাই নয় এত কিছু পেয়েও অহংকারী ও ভোগ-বিলাসে মত্ত না হয়ে একটি প্রভাব বিস্তারকারী জীবন নির্বাহ করে ভাই যেভাবে নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেছেন তা সত্যিই আমাদের জন্য অনেক বেশি অনুকরণীয় ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মোঃ জাহাঙ্গীর কবির শরীফ
লোক প্রশাসন বিভাগ সাবেক শিক্ষার্থী(২০১২/১৩ সেশন),
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(বর্তমান সৌদি আরব প্রবাসী)