
২০০৩ সালের পর অস্ট্রেলিয়ায় এটাই হবে টাইগারদের প্রথম টেস্ট সিরিজ। দুই ম্যাচের এ সিরিজ খেলতে শুক্রবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে দেশ ছেড়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও তার সতীর্থরা।
কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু আগেভাগেই অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছেন টাইগাররা। সিরিজ শুরুর আগে স্থানীয় একটি দলের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবেন শান্তরা। ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হবে সিরিজের প্রথম টেস্ট। ২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে শুরু হবে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। ২০০৩ সালে দুটি টেস্ট হয়েছিল যথাক্রমে কেয়ার্নস ও ডারউইনে। সেবার কেয়ার্নসে ইনিংস ও ৯৮ রানে এবং ডারউইনে ইনিংস ও ১৩২ রানে জিতেছিল অজিরা।
গুরুত্বপূর্ণ এ সিরিজ শুরুর আগে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। চোটে পড়েছেন (সাইড স্ট্রেন) দলের শীর্ষ পেস তারকা নাহিদ রানা। পুরো সিরিজ থেকেই তিনি ছিটকে গেছেন। নাহিদ রানা বর্তমান দলের সেরা বোলার হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন দাস চোটের কারণে প্রথম টেস্টের দলে ছিলেন না। তবে গতকাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছে, লিটনকে প্রথম টেস্টের দলেই ফেরানো হয়েছে। আজ তিনি অস্ট্রেলিয়ায় রওনা হয়ে যাবেন।
আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দুটি হোম সিরিজ জয়ের পর জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে একমাত্র টেস্টটি হেরে বসেছে বাংলাদেশ। সেই ক্ষত না শুকাতেই এবার অস্ট্রেলিয়ার ডেরায় টেস্ট খেলতে হবে শান্তদের। অন্যদিকে গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজ সিরিজ খেলেছে অস্ট্রেলিয়া, যা তারা জিতেছে ৪-১-এ। এরপর সাদা পোশাকে খেলেনি অজিরা। সাত মাসেরও বেশি সময় পর টেস্ট খেলতে নামছেন মিচেল স্টার্করা।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খুব বেশি টেস্ট খেলা হয়নি বাংলাদেশ দলের। এখন পর্যন্ত ছয়টি টেস্ট খেলেছে দুই দল। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া পাঁচটি ও বাংলাদেশ একটি জয় পেয়েছে। ২০১৭ সালে মিরপুরে ২০ রানের জয় পেয়েছিল টাইগাররা। প্রায় একপেশে এ দ্বিপক্ষীয় লড়াইয়ে অজিরা তিনটি ম্যাচে জিতেছেন ইনিংস ব্যবধানে।
ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার মাঠে একবারই টেস্ট সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। টেস্ট মর্যাদা লাভের তৃতীয় বছরে ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় নিজেদের একমাত্র টেস্ট সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। এরপর ২৩ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে এবার। সংগত কারণেই গোটা বাংলাদেশ দলের সবার জন্যই এ প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে।
তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের মতো বিখ্যাত ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। সুযোগটি কাজে লাগাতে মরিয়া তিনি। এ লম্বা বিরতির কারণে অনেক ক্রিকেটারই কÅvরিয়ার শেষ করেছেন অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে। সেই তালিকায় নাম উঠবে না বলে ভীষণ খুশি ২৭ বছর বয়সী শান্ত। তিনি বলেন, ‘খুবই ভাগ্যবান মনে করছি, অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে পারব বলে। গত ২৩ বছরে আমাদের আরো বেশি ম্যাচ খেলা উচিত ছিল। আমরা যদি আরো ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতাম, তাহলে হয়তো আরো বেশি সুযোগ হতো।’
অস্ট্রেলিয়ার তারকাদের বিপক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘টিভিতে যাদের খেলা দেখতাম, এখন তাদের বিপক্ষে খেলতে পারছি। একজন খেলোয়াড় হিসেবে ভেতরে অনেক উত্তেজনা কাজ করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তাদের ভালো বোলিংয়ের বিপক্ষে ভালো করার এটা বড় সুযোগ। এ চ্যালেঞ্জটা নেয়ার জন্য আমাদের ব্যাটসম্যানরা অনেক রোমাঞ্চিত। কত রান বোর্ডে (স্কোরবোর্ডে) দিতে পারব সেদিকে না তাকিয়ে চ্যালেঞ্জটা কত ভালোভাবে সামলাতে পারছি এবং উপভোগ করছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন নিয়ে তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় যে কন্ডিশন, সেখানে অবশ্যই প্রত্যাশা আছে তারা (পেসাররা) ২০ উইকেট নিয়ে দেবে। পাশাপাশি দুজন ভালো অভিজ্ঞ স্পিনারও আছে, তারা পেস বোলারদের সাহায্য করবে। স্কোয়াডে যেসব পেস বোলার আছে, তারা সক্ষম। মুশফিক (হাসান) ছাড়া সবাই অভিজ্ঞ, অনেক বছর ধরে খেলছে। যদি তাদের সেরা বোলিংটা করতে পারে, অবশ্যই ২০ উইকেট নেয়া সম্ভব।’
২০০৩ থেকে ২০২৬—এ ২৩ বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশ দলে। একটি সময় নিয়মিত হেরে যাওয়া টাইগাররা এখন পরাশক্তিদের বিপক্ষেও লড়াই করার সাহস অর্জন করেছে। সমর্থকদের প্রত্যাশাও বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে সেই প্রত্যাশা নিয়ে শান্ত বলেন, ‘এটা ভালো, দর্শকদের প্রত্যাশা বেড়েছে। তারা চায় আমরা প্রতিটি ম্যাচ জিতি, যা একটি ইতিবাচক দিক। ২৩ বছর আগে হয়তো এ জিনিসটা ছিল না। এটা একটা বড় অর্জন। এখন বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো দলের বিপক্ষে জয়ের কথা চিন্তা করে। আমাদের চেষ্টা থাকবে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে জয় ছিনিয়ে আনার।’
আপাতত কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন শান্ত। এরপর চেষ্টা করবেন ভালো ক্রিকেট খেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে। তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর ধরে যেভাবে টেস্ট ক্রিকেট খেলছি, চেষ্টা করব সেভাবেই খেলার। কন্ডিশন ভিন্ন হবে, তাই যত দ্রুত সম্ভব মানিয়ে নিতে হবে। আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই। টেস্ট দলটা একটা ভালো অবস্থানে আছে। এ জায়গা থেকে আমরা যেন নিচের দিকে না যাই এবং সামনে আরো কীভাবে উন্নতি করতে পারি, সেটাই মূল লক্ষ্য থাকবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে জয় ছিনিয়ে আনার।’
অস্ট্রেলিয়ায় জয় কিংবা ড্রর কথা উল্লেখ না করলেও শান্ত জানালেন, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সম্মান আদায়ের চেষ্টা থাকবে তাদের। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়া যেন ফের ঘরের মাঠে সাদা পোশাকে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়, তা নিশ্চিত করতে চান। শান্ত বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে ওখানে (অস্ট্রেলিয়া) ভালো ক্রিকেট খেলা এবং সম্মান অর্জন করা। যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্রিকেট খেলতে পারি, অবশ্যই তারা ভবিষ্যতে আবার আমন্ত্রণ জানাবে। প্রতিটি ম্যাচই জেতার জন্য খেলি। তবে ওদের (অস্ট্রেলিয়া) কতটুকু কঠিন সময় দিতে পারি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রথম টেস্টের বাংলাদেশ দল:
নাজমুল হোসেন (অধিনায়ক), সৌম্য সরকার, সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, অমিত হাসান, জাকের আলী, মেহেদী হাসান মিরাজ (সহঅধিনায়ক), তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, খালেদ আহমেদ, এবাদত হোসেন, মুশফিক হাসান, লিটন দাস।