‘আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এসআই হুমায়ুন কবির বলছি…’, ‘মিরপুর থানার ওসি ফরমান আলী বলছি…’ কিংবা ‘অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলছি…’। ফোনের ওপাশ থেকে এমন পরিচয় শুনে অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করে বসেন।
এরপর শুরু হয় ধাপে ধাপে নির্দেশনা। কখনো হোয়াটসঅ্যাপের সেটিংসে যেতে বলা হয়, কখনো ফোনের বিভিন্ন অপশন চালু করতে বলা হয়।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার পরিচয়ে ফোন করে মামলার ভয় দেখিয়ে এবং তদন্তের নামে বিভিন্ন তথ্য ও ভেরিফিকেশন কোড আদায় করে তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা।গত ১ আগস্ট দুপুরে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এসআই হুমায়ুন কবির পরিচয়ে মেহেদি মাসুদ করিমের হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তার ফোন নম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ‘মূল সার্ভারে’ যুক্ত হয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। পরে তাকে কিছু নির্দেশনা মানতে বলা হলেও বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত ফোন কেটে দেন।
এর আগে গত ১২ জুন মিরপুর থানার ওসি ফরমান আলী পরিচয়ে মো. গুলজারের হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তার নম্বর থেকে পুলিশের এক কর্মকর্তাকে ছবি ও বিভিন্ন বার্তা পাঠানোর অভিযোগ তোলা হয়। এরপর হোয়াটসঅ্যাপের সেটিংসে গিয়ে ফোন ‘ঠিক করে দেওয়ার’ কথা বলে প্রতারকরা কৌশলে তার ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সহকর্মীদের সতর্কতায় তিনি ফোন কেটে দিয়ে নম্বরটি ব্লক করে দেন।
মামলার ভয় দেখিয়ে বিকাশের টাকা হাতিয়ে নেওয়া
গত ৩০ জুলাই দুপুরে ০১৩৫১৬৬৪৪০৫ নম্বর থেকে পারুল আক্তার নামে এক নারীকে ফোন করে নিজেকে উত্তরা ট্রাস্ট সুপারশপের ম্যানেজার পরিচয় দেন এক ব্যক্তি। বলা হয়, ভুল করে ওই নারীর মোবাইল নম্বর দিয়ে একটি মামলার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এর প্রায় দুই মিনিট পর ০১৩৫১৬৬৪৪০৭ নম্বর থেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার পরিচয়ে ফোন আসে। অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পরিচয় দিয়ে জানান, ওই নারীর মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যা একটি মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
ওই নারী জানান, ট্রাস্ট বাজারের সঙ্গে তার কোনো লেনদেন নেই এবং ম্যানেজারের ভুলের কারণেই তার নম্বর ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাইলে কল করা ব্যক্তি জানান, আপাতত তার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রাখা হবে। এরপর তদন্তের কথা বলে তাকে কল না কেটে লাউডস্পিকারে রাখতে বলেন এবং বিকাশ থেকে আসা এসএমএসের ভেরিফিকেশন কোড পড়ে শোনাতে নির্দেশ দেন। পরপর দুটি এসএমএসে আসা ছয় সংখ্যার কোড তিনি তাদের জানিয়ে দেন।
পরে তারা ওই নারীর বিকাশ অ্যাকাউন্ট কোথা থেকে খোলা হয়েছিল এবং অ্যাকাউন্ট খোলার সময় পাওয়া ফর্ম নম্বর সংরক্ষণ করা আছে কি না, তা জানতে চান। এরপর মোবাইলের ক্যালকুলেটর খুলে বিভিন্ন সংখ্যা দিয়ে হিসাব করতে বলেন এবং ফলাফলের প্রথম কয়েকটি সংখ্যা জানাতে নির্দেশ দেন। এসব তথ্য তাদের ‘সার্ভারে’ জমা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।
একপর্যায়ে প্রতারকরা তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে সর্বশেষ কত টাকা ছিল, তা জানতে চাইলে ওই নারীর সন্দেহ হয়। তিনি জানতে চান, কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে তারা সত্যিই পুলিশ। জবাবে তারা দাবি করেন, প্রতারকরা বিকাশের অফিসিয়াল এসএমএস পাঠাতে পারে না এবং তারা যেহেতু বিকাশের পিন নম্বর চাইছেন না, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায়।
শেষে প্রতারক চক্র জানায়, ভেরিফিকেশন শেষ হয়েছে এবং তার দেওয়া সব তথ্য তাদের ‘সার্ভারে’ সফলভাবে জমা হয়েছে। এরপর আর কোনো এসএমএস পাঠানো হবে না বলেও জানান তারা। এর মাঝে প্রতারক চক্র দুইবার মোবাইল থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। এই ফোন আলাপের ১৬ মিনিটের রেকর্ড বাংলানিউজের হাতে এসেছে।
১৬ মিনিট কথা বলে দুই দফায় ৯৯৯ টাকা
ভুক্তভোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পারুল আক্তার বলেন, অফিসে কাজ করার সময় ০১৩৫১৬৬৪৪০৫ নম্বর থেকে কল আসে। নিজেকে উত্তরা ট্রাস্ট সুপারশপের ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে বলা হয়, ভুল করে আমার নম্বর দিয়ে মামলা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দুই মিনিট পর ০১৩৫১৬৬৪৪০৭ নম্বর থেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার পরিচয়ে কল আসে। প্রায় ১৬ মিনিট কথা বলে নানা কৌশলে তারা আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে দুই দফায় ৯৯৯ টাকা করে হাতিয়ে নেয়। সন্দেহ হলেও কথার ফাঁকে তারা আমাকে বিভ্রান্ত করে।
পারুল বলেন, প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, এ চক্র দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি পুলিশ পরিচয়ে ফোন, মামলা বা ভেরিফিকেশনের নামে প্রতারণা নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি, যাতে আর কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হন।