
একটি দেশের উন্নয়নের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়েরই অংশগ্রহণ অপরিহার্য। নারীকে বাদ দিয়ে কখনই দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীকে কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশের নারীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগদান করছেন এবং দেশের কল্যাণে অকাতরে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
একজন নারী যেমন সুনিপুণভাবে সংসার সামলান, ঠিক তেমনি পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে তার দক্ষতা দ্বারা দেশ পরিচালনায়ও স্বাক্ষর রাখেন। নারীকে যেমন কর্মস্থানে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়, ঠিক তেমনই একজন মমতাময়ী মা হিসেবে শিশুসন্তানকে লালন-পালন করতে হয়। মা ও সন্তানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সন্তানের দৈনন্দিন জীবনের জন্য তার মায়ের প্রয়োজন। সন্তানকে নিজের থেকে দূরে রাখা একজন মায়ের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলেও সন্তান জন্মদানের পর পুনরায় তাদের আবার কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা দেয় এক বিরাট সমস্যা, নারীর কর্মক্ষেত্রে তার সন্তানকে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই।
কর্মস্থানগুলোতে সন্তানের দেখাশোনার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কর্মজীবী মায়েদের বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানকে বাড়িতে রেখে আসতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের নারী উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোয় কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সীমিত কিছু ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে ওঠে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
আবার এসব ডে-কেয়ার সেন্টার আলাদাভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় গড়ে উঠেছে, যা সব সময় নারীর কর্মক্ষেত্রের কাছে অবস্থিত হয় না। নারীর নিজ কর্মস্থানে সন্তান রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নারীরা নিজ কর্মস্থানেও তাদের সন্তান নিয়ে রাখতে পারেন না। ফলে সরকারের ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর ডে-কেয়ার সেন্টার কর্মজীবী নারীদের তেমন কোনো উপকারেই আসে না।
ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় মায়েরা সে অবধি সব সময় পৌঁছাতে পারেন না আবার বেসরকারি ডে-কেয়ার সেন্টার সব সময় মায়েদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় তারা সেগুলোতে তাদের সন্তানদের রাখতে ভরসা পায় না। এর ফলে তৈরি হয়েছে নানান সমস্যা। নারীদের কাছ থেকে তাদের সন্তান দূরে থাকার ফলে শিশুরা মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মায়েরা বাধ্য হয়ে নির্ভর হচ্ছে প্যাকেটজাত দুধের ওপর, যা মা ও শিশু উভয়েরই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। মা ও শিশু একে অপরের থেকে দূরে থাকায় তাদের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার অনেক নারীকে পরিবার সন্তানের কষ্টের দোহাই দিয়ে তাদের চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে, যা নারী উন্নয়নের একটি বড় বাধা। একই চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও।
স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সন্তানদের জন্য কোনোরকম ডে-কেয়ার তো দূর; ফিডিং কর্নার পর্যন্ত নেই। অনেক নারী শিক্ষার্থী তাদের পড়াশোনা চলাকালীন মা হন। কিন্তু দেখাশোনার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা শিক্ষা লাভ থেকে ঝরে পড়ছেন, যা বাংলাদেশের উন্নয়নে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবসমাজকে বাঁচিয়ে রাখতে মাতৃত্ব অপরিহার্য। নারীরা উন্নয়নের ধারায় শামিল হলেও মাতৃত্ব আজ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাতৃত্ব কখনই বাধা হতে পারে না।
এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নারীরা ক্রমে পিছিয়ে পড়বেন, যা বাংলাদেশের জন্য কখনই কল্যাণকর হবে না। তাই মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি কর্মস্থানে ডে-কেয়ার গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ারের পাশাপাশি বিভিন্ন জনসমাগম স্থানে ফিডিং কর্নার গড়ে তুলতে হবে।