চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ দেশ থেকে গুম, মানবাধিকার হরণের চিরঅবসান চেয়েছে গণতন্ত্রকামী জনসাধারণ। তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির অগণিত নেতাকর্মী বছরের পর বছর গুম ও মানবাধিকার হরণ ঘটনার শিকার হন। সেই বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর গুম ও মানবাধিকার কমিশন গঠনে অংশীজনের মূল সুপারিশগুলো উপেক্ষা করছে,এটা অবশ্যই হতাশাজনক। এই দুই আইন মন্ত্রিসভায় ১০ আগস্ট অনুমোদিত হয়েছে। মানুষকে অত্যাচারিত করবার পথ উন্মুক্ত রাখার দায় নির্বাচিত সরকারের নেওয়া উচিত নয়। গুম ও মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে অংশীজনের সুপারিশ সরকারকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে।
৩.
জ্বালানি সংকট এই ছয় মাসে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘদিনের সমস্যা। যদিও জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কম, তারপরও এটি ৮ শতাংশের ওপরে। টানা মূল্যস্ফীতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন দেশ, জ্বালানির অভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারখানা।
মূল্যস্ফীতি থেকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট– কোনোটিই গেল ছয় মাসে বর্তমান সরকারের সৃষ্ট নয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ও জাতীয় কিছু আকস্মিক সংকট। অভিযোগ উঠছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমলে উৎপাদন বাড়িয়ে ৩০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছুলেও সরবরাহ লাইন ১৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার কোন পদক্ষেপগুলো নিয়েছে? সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সংসদে স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।
ভোলাসহ সমুদ্র উপকূল অঞ্চলে গ্যাসক্ষেত্র থেকে অংশীজনদের পক্ষ থেকে গ্যাস আহরণে বারংবার দাবি জানানো সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আমলে আমদানির দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। জরুরি আমদানি, ঋণ ও ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি আপাতত সামলানোর যে চিরকালীন ‘সরকারি’ নীতি, সেখান থেকে বেরিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির উৎস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্রিড উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুতের কথা বরংবার বলা হয়; আদতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করে জোড়াতালি দিয়ে চলে সরকারের পর সরকার। এ ক্ষেত্রে যেহেতু মেগা প্রজেক্টের সম্ভাবনা নাই, তাই কোনো সরকারই এ ব্যাপারে মনোযোগী হয় না।
মনে রাখতে হবে, দেশের সাফল্য কেবল প্রবৃদ্ধির অঙ্কে বোঝালে হবে না। মানুষের প্রকৃত আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দেশের মূল সাফল্য। ‘কোটা না মেধা’ আন্দোলনের পথ বেয়ে চব্বিশের অসামান্য গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। গণতন্ত্রের জন্য বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম রয়েছে। বিএনপি সরকারকে বৈষম্যহীন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। সুশাসন ও জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের সোপান। সংকট লুকিয়ে রাখবার বা অস্বীকারের কোনো বিষয় নয়। গ্যাস বা বিদ্যুৎসহ যে কোনো সংকট জাতির সামনে পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরে অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সম্মিলিত প্রয়াসে সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা জাতিকে যূথবদ্ধ মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেবে। এই ক্ষেত্রে সরকারকে উত্তম ব্যবস্থাপকরূপেও আবির্ভূত হতে হবে।
আন্তর্জাতিক বা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারকে দায়িত্বের ছয় মাসে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়েছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ও ভারত-চীনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ বুঝে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে অভ্যন্তরীণ চটজলদি ও তরল লোকপ্রিয়তার চেয়ে দেশের সুদূরপ্রসারী স্বার্থ, বিনিয়োগ ও আন্তঃদেশীয় সম্পর্ককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া সংগত হবে।
ছয় মাস অতিক্রমকারী সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সরকার কেবলমাত্র বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নয়। দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সরকার হয়ে উঠতে হবে। নিজ মত ও ধর্ম, আচার ও আচরণ, অভ্যাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত হলেই দেশে সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে।