
বাফুফের বর্তমান কমিটির মেয়াদ এক বছর দশ মাসের মতো। এই সময়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যেমন সন্তুষ্ট, তেমনি করে লিগের অবস্থা নিয়ে সমকালের সঙ্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিছুটা হতাশ বাফুফে সহসভাপতি ও ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রায় দুই বছর মেয়াদে আপনার চোখে ফুটবলের সাফল্য কী?
জাহেদী: সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফুটবলটা আবার ফিরে এসেছে। দ্বিতীয়ত, ঘরের মাঠে আমরা যতগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছি, সেগুলোতে স্টেডিয়ামে উপচে পড়া দর্শক হয়েছে। ঢাকার বাইরে আমরা এখন খেলাকে আবার জাগ্রত করেছি। বিভিন্ন ধরনের টুর্নামেন্ট হচ্ছে। লিগ আবার অ্যাক্টিভেট করা হয়েছে। তবে লিগের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কারণে লিগকে যতটা প্রাণবন্ত করা দরকার ছিল, ততটা এখনও হয়ে ওঠেনি। তবে আমাদের প্রচেষ্টা আছে। আমাদের প্রেসিডেন্ট নিজেই লিগেরটাও খুবই ক্লোজলি মনিটর করছেন। জাতীয় দলের ব্যাপারে বলতে গেলে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। ইউরোপিয়ান লিগে খেলা হামজা চৌধুরীর মতো ফুটবলার এখানে খেলছে। তাকে দেখে অন্যরাও আসছে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন দেখা অনেক প্রবাসীর কাছ থেকে আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ফুটবলের কার্যক্রম দেখেই প্রবাসীরা আগ্রহী হচ্ছে। আমি যদি বয়সভিত্তিক ফুটবলে আসি, তাহলে বলতে হবে অনূর্ধ্ব-২০ সাফে চ্যাম্পিয়ন হলাম। ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টে আমরা এএফসির অ্যাওয়ার্ড পেলাম। সবকিছু মিলে আমি যদি দুই বছরের পরিক্রমাটা দেখি, এখানে অর্জন বেশ আছে।
আপনি বলেছেন যে আরও অনেক কিছু করার ছিল, মানে আর কী কী করা যেত বলে আপনি মনে করেন?
জাহেদী: ঘরোয়া ফুটবলের প্রাণ হলো লিগ। প্রিমিয়ার লিগ, বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন– এগুলো। এই লিগগুলোকে আমাদের আরও প্রাণবন্ত করতে হবে। ক্লাবগুলোরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, তাদেরও কিছু রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট আছে। যেমন এবার আমরা দুটি বড় ক্লাবকে নিয়ে সমস্যার ভেতরে আছি ফিফার তাদের রেস্ট্রিকশনের কারণে। এগুলো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারলে যখন ভেতরে আমাদের লিগ প্রাণবন্ত হয়ে যাবে, সেখানেই প্লেয়ার তৈরি হবে। সেখানে প্লেয়ার স্কাউটিং করা যাবে এবং সেটা করলে আমরা আরও শক্তিশালী ন্যাশনাল টিম গড়ে তুলতে পারব। স্কুল লেভেলের ফুটবল, জেলা লেভেলের ফুটবল– এগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করতে হবে, আরও সক্রিয় করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য তখন প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসবে।
বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের জন্য কতটা শক্তিশালী দল গঠন করেছেন?
জাহেদী: অতীতে কোনো টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়ার আগে দেখা যেত এক সপ্তাহের ক্যাম্প করা হতো। সেটা থেকে আমরা বের হয়েছি। অনূর্ধ্ব-২০ দলটির জন্য ছয় সপ্তাহের ক্যাম্পের আয়োজন করলাম। অনূর্ধ্ব-১৭ দলের জন্য প্রায় তিন মাসের ক্যাম্প করব। আমরা ক্যাম্পগুলো লম্বা করতে পারছি, যেটা তাদের ডেভেলপমেন্ট, সিলেকশন, কোঅর্ডিনেশন, সমন্বয় টিমের ভেতরে– এগুলোর জন্য কাজে দিচ্ছে। কিন্তু মুশকিলটা হলো আমরা ম্যাচ খেলতে পারছি না। দেশের বাইরে যেতে গেলে ভিসা সমস্যা। দেশের ভেতরেও আমরা বড় কোনো দলের সঙ্গে ম্যাচ খেলতে পারছি না। যশোরের শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমিতে অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাটা ভালোভাবে করতে পেরেছি। কিন্তু এখন তারা ঢাকায় এসেছে। ঢাকায় অনুশীলনের মাঠ নেই। আছে কমলাপুর স্টেডিয়াম। কিন্তু সেটা হলো টার্ফের। আমরা যদি ঘাসের মাঠ পেতাম, খুব ভালো হতো। একটা ফুটবল ফেডারেশনের ন্যাশনাল লেভেলের এজ গ্রুপ বা টিমের জন্য একটা খেলার জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই।
একাডেমিগুলো নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
জাহেদী: আমাদের ডেভেলপমেন্ট কমিটির কাজটা কী? আমাদের কাজ হলো ন্যাশনাল টিমের জন্য পাইপলাইনটা রেডি করে দেওয়া। আমাদের যে অনূর্ধ্ব-১৭ টিম, অনূর্ধ্ব-২০ টিম– এদের ভালো করে ডেভেলপ করা, যাতে দুই বছর, পাঁচ বছর পরে এরাই তখন ন্যাশনাল টিমকে আরও শক্তিশালী করবে। তো সেই কাজটা আমরা যতদূর সম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গে করার চেষ্টা করছি। যশোরে শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি আমাদের ন্যাশনাল টিমের কোচিং অ্যান্ড ক্যাম্পিংকে সাপোর্ট করে যাচ্ছে, সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের একাডেমি আরও দু-একটা বাংলাদেশে ডেভেলপ করুক এবং এটা দরকার। তখন হবে কী, আমাদের ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টটা আরও ভালোভাবে করা যাবে। শুধু একটা একাডেমির ওপর ভরসা করে থাকাটা তো খুব মুশকিল। তাই আমার ইচ্ছাটা হলো অন্যদের উদ্বুদ্ধ করা, যাতে এই ধরনের একাডেমি আরও দু-একটা বাংলাদেশে উঠে আসে।
প্রবাসী ফুটবলারদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
জাহেদী: প্রবাসীদের ব্যাপারটা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান কার্যক্রম দেখে বা ফুটবল নিয়ে যে মানুষের প্রত্যাশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এটা দেখে তারা নিজেরা কিন্তু উৎসাহিত হয়ে আসছে। তাদের মা-বাবাও তাদের এখানে নিয়ে আসছেন বা পাঠাচ্ছেন বা উৎসাহিত করছেন। তো এটা তো একটা ভালো দিক। ওভারঅল তাদের পারফরম্যান্সও খুব ভালো। এই রোনান ডেক্লান তো খুবই ভালো খেলেছিল আমাদের অনূর্ধ্ব-২০তে। এবার আমাদের অনূর্ধ্ব-২০ টিমে বেশ কয়েকজন আছে, দে আর রিয়েলি গুড। সব থেকে আমি খুশি যে কারণে, আমি যশোরে যে তিন দিন ছিলাম ক্যাম্পে, আমি দেখলাম আমাদের স্থানীয় যেসব ফুটবলার আছে আর যারা বাইরে থেকে এসেছে, তাদের মধ্যে সম্পর্কটা খুবই আন্তরিক। এখানে কোনো ধরনের পার্থক্য নেই এবং তারা নিজেরা খুব সুন্দরভাবে মেশে। এবং খেলার ক্ষেত্রেও তাদের সমন্বয়টা খুব ভালো। প্রবাসী আর স্থানীয়দের মধ্যে দূরত্ব নেই।
দেশের স্বার্থে অনেক সময় ক্লাবগুলো ফুটবলার ছাড়ে না।
জাহেদী: আমাদের অধিকাংশ ক্লাবই খুব ভালোভাবে সহযোগিতা করে। আমরাও ক্লাবের জন্য সহযোগিতা দিই, যেমন এবার লিগে বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় রাখার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, এটা আমরা প্রত্যাহার করেছি। ক্লাবগুলো এতে খুশি। আবার বেশির ভাগ ক্লাবই কিন্তু যেখানে আমাদের ন্যাশনাল ক্যাম্পে ডাক পড়েছে, তাদের ছেড়ে দিয়েছে। একটা ক্লাব বাদে, আমি তাদের আচরণে অত্যন্ত ব্যথিত। অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দল গঠনের জন্য তাদের তিনটি প্লেয়ারকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম দিতে কিন্তু তারা সহযোগিতা করেনি। তারা আমাদের জাতীয় দলের ক্যাম্পে প্লেয়ারকে আসতে দিল না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে, খবরের কাগজে দেখলাম সেই প্লেয়ারগুলোই আবার জেলা লেভেলে আপনার খ্যাপ খেলে বেড়াচ্ছে। তো এটা তো অত্যন্ত দুঃখজনক।