
সারাদিন মাছের বাজার ঘুরে ইলিশ ব্যবসায়ীদের কিছু সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলাম। তাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন ছিল কেন ইলিশের মূল্য এত বেশি। তারা নানা ধরনের সমস্যার কথা আমাকে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘকাল ধরে আমরা দেখছি ইলিশের ঊর্ধ্বমুখী দাম। আজ থেকে দশ-বারো বছর আগে ইলিশের দাম অনেক কম ছিল। ক্রেতাদের খুব কম দামে ইলিশ কেনার সুযোগ হতো।
তখন ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিতে বিক্রি হয়েছিল ৪০০-৫০০ টাকায়। কিন্তু সেই ৫০০ গ্রাম ইলিশের দাম এখন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এখন ইলিশের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বর্তমানে এক কেজি ইলিশ তিন হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। জেলেরা বলছেন, সম্প্রতি বছরগুলোতে ইলিশ আহরণ অনেক কমে এসেছে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার মৎস্য আহরণ বন্ধ, জাটকা নিধনসহ নানা উদ্যোগ নিলেও ইলিশের উৎপাদন বাড়েনি, বরং কমেছে।
মাছের আড়তদারকে প্রশ্ন করলে তারা বলেন, চাহিদার তুলনায় কম আহরণে ইলিশের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ইলিশের দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে ‘হাতবদল’। জেলে পর্যায় থেকে ব্যবসায়ীদের একহাত থেকে অন্যহাতে কয়েক দফা ঘুরতে ঘুরতে ভোক্তা পর্যায়ে যেতে মূল্যের দ্বিগুণ হয়ে যায়। তারা আরও বলেন, ইলিশ ধরে আড়ত পর্যন্ত নিয়ে আসতে জেলেদের প্রতি কেজিতে গড়ে খরচ পড়ছে ৪৭১ থেকে ৫০৪ টাকা। আর জেলেদের কাছ থেকে এই মাছ ভোক্তার ঘরে যাচ্ছে কমপক্ষে পাঁচ হাত ঘুরে। আর প্রতি হাতে ৬০ শতাংশ করে দাম বাড়ছে। ফলে বর্তমানে প্রতি কেজি ইলিশ আকারভেদে ৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
এক জেলেকে কাছে পেয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ছোট, মাঝারি ও বড় নৌকা বা ফিশিং ট্রলারে ইলিশ ধরা হয়। ছোট নৌকায় যারা মাছ ধরে, তাদের প্রতি কেজি ইলিশ ধরতে খরচ হয় ৪৮৪ টাকা। মাঝারি নৌকার প্রতি কেজি মাছ ধরার খরচ পড়ে ৫০৪ টাকা। আর বড় নৌকা বা ফিশিং ট্রলারে প্রতি কেজি ইলিশ ধরতে খরচ হয় ৪৭১ টাকা। এই মাছ জেলের হাত থেকে প্রথমে আসে মাছঘাটের মহাজনের কাছে। এরপর যায় আড়তদারের হাতে। আড়তদার থেকে পাইকারি ব্যবসায়ী হয়ে আসে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। এই পাঁচ ধাপের প্রতিটিতে ৫৯-৬০ শতাংশ হারে দাম বাড়ে। খুচরা বাজারেও এই মূল্য বৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা গেছে।
জেলে ও বোট মালিকরা জানিয়েছেন, ইলিশের বেশি দামের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে যেসব দাদন ব্যবসায়ী জেলেদের পেছনে বিনিয়োগ করেন, তারা নদীর ঘাটে মাছ বিক্রির সময় সর্বনিম্ন দর ঠিক করে দেন। দাদন ব্যবসায়ীদের ঠিক করা সর্বনিম্ন দামের বেশি উঠতে পারেন না আড়তদার বা পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এছাড়া চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা, কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি, মজুদ ও সিন্ডিকেট এবং জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায়ও ইলিশের দাম বাড়ছে। এছাড়া জেলেদের মজুরি, ট্রলার বা নৌকার রক্ষণাবেক্ষণ, জাল মেরামত, বরফ ও অন্যান্য উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ইলিশ আহরণের খরচ বেড়েছে।
বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদককে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পুরো মৎস্য আহরণ ব্যবসা এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। ইলিশ তো সোনার হরিণ! একদিকে মৎস্য আহরণ কমেছে, অন্যদিকে খরচ বেড়েছে। এতে আহরিত মাছ দিয়ে খরচ মিটিয়ে টাকার মুখ তো তেমন দেখতে পান না বোট মালিকরা। বাড়তি দামে ইলিশ বিক্রি হলেও উৎপাদন কম হওয়ায় পোষানো যায় না। কিন্তু দাদন ব্যবসায়ী ও পাইকাররা ঠিকই মুনাফা করে যাচ্ছে। একজন মৎস্য কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ উৎপাদনে ধস নেমেছে। নদীতে জেলের জালে, আড়তে এবং বাজারে ইলিশের সরবরাহ প্রতিবছরই কমছে।
আর উৎপাদনে ধস নামার কারণে হাটবাজারে এখন আর আগের মতো ইলিশ মিলছে না। কিন্তু বেড়েই চলছে ইলিশের দাম। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ ইলিশের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। নদীতে চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় ইলিশের চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় প্রজননেও ব্যাঘাত ঘটছে। তিনি আরও বলেন, নদীতে এখনও অবাধে কারেন্ট জাল ও অবৈধ জাল ব্যবহৃত হচ্ছে। ছোট জেলেদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা হলেও প্রভাবশালী অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা সব সময় নেওয়া হয় না। তাই ইলিশ রক্ষায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ইলিশ যে নদীতে পাওয়া যায় সেই নদীগুলোতে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং, ডুবোচর অপসারণ, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে ইলিশ আরও সংকটে পড়তে পারে। তা না হলে আমাদের এই সুস্বাদু জাতীয় মাছ অমাবস্যার চাঁদ হিসেবে বারবার নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের কাছে অধরা হয়ে থাকবে।