
নুসরাত জাহান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
বিজয়ের মাস! ওই লাল-সবুজ পতাকাটি যেন বাতাসের তালে উল্লাসে মেতে উঠেছে। সেই ১৯৭১-এ আমার ভাইয়ের রক্ত দ্বারা সজ্জিত হয়েছিল এই পতাকা। ওই রক্তবর্ণ বৃত্তটি কেবলমাত্র একটি রং নয়—হাজারো সন্তানহারা মায়ের সমুদ্রসম চোখের জল, এ বাংলার সাহসী বীর যোদ্ধাদের ত্যাগ আর বিসর্জন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে শহীদদের উৎসর্গকৃত প্রতিটি রক্তবিন্দু আজ বিজয়ের ৫৪ বছরে শুকিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু বিজয়ের মাসে তাদের স্মৃতি স্মরণে প্রকৃতিও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর—দেশ এখন নিরাপদ বলা চলে। দিনদুপুরে আর গুলির আওয়াজ শোনা যায় না, বারুদের গন্ধ নাক বিষিয়ে তোলে না, মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়া হয় না তার কলিজার টুকরা সন্তানকে, ১১ বছরের বালিকাকে হুট করে জলপাই রঙের ট্যাংক এসে তুলে নিয়ে যায় না। চারদিকে নিস্তব্ধতা, নিরবতা। গ্রামের ছোট চায়ের দোকানটি, যেটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল, আজ সেখানে সকলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। রেডিওতে কী জানি খবর শোনা যাচ্ছে। নাহ্! এইবার আর কারচুপি নয়—পাকসেনারা আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেছে! তার মানে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বাধীন হয়েছে? হ্যাঁ! বিজয় অর্জিত হয়েছে। এ দেশের মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ বিজয়।
দোকান থেকে খানিকটা দূরেই একজন মধ্যবয়সী মায়ের ঘর। তার খোকাও যুদ্ধে গিয়েছিল—তা মাসখানেক হবে। পাশের বাড়ির করিমও গিয়েছিল, সে আজ ভোরে বাড়ি ফিরেছে। ফেরেনি কেবল এই দুঃখিনি মায়ের খোকা। সে যে ফিরবে না—তার মতো সাহসী বীরের প্রাণের বিনিময়েই তো অর্জিত হয়েছে এই মহান বিজয়!
এই বিজয় বিজয়!
রক্তের আর ত্যাগের অর্জন—ঐক্যবদ্ধ বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক স্মরণীয় অধ্যায়। প্রতিটি পাতায় লেখা হয় সংগ্রামের গল্প। ২০২৫-এর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আজও আমাদের বিবেক প্রশ্নবিদ্ধ! আমরা কি তবে মহান বিজয়কে ধারণ করতে ব্যর্থ?
বাংলা মায়ের বুকে এখনো রক্ত ঝরে, তার সন্তানের দেহখানি ধুলোয় লুটায়! প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করায় মায়ের ভাষার লড়াই—১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির কথা, ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম—৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের কথা, বর্বরতার ইতিহাস—২৫ মার্চের কথা, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের কথা।
তবুও বারবার বলতে ইচ্ছে হয়—
জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো,
এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো।