
মো. নূরে আলম ছিদ্দিকী
কমান্ডার,বাংলাদেশ নৌবাহিনীর
নতুন প্রজন্মের সুস্থ স্বাভাবিক মার্জিত শিষ্টাচার-সংবলিত সামগ্রিক আচরণ বিনির্মাণে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে পরিবারের বয়স্কজনদের দ্বারা প্রদর্শিত পথ বা অনুশীলনের ভূমিকা অপরিসীম। পরিবারের গুরুজনরা নিজেরা ভুল পথ অনুসরণ, অবিবেচনাপ্রসূত আচার-ব্যবহার চর্চা করে কনিষ্ঠদের সঠিক পথে চলার আদেশ-উপদেশ দিলে তা শতভাগ বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি
ব্যক্তিগতভাবে মানুষ যে নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, সে মোতাবেক জীবনচারের মধ্য দিয়ে তার আত্মমর্যাদাবোধ এবং ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা যদি নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থেকে সৎ পথে চলাসহ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, প্রতিবেশীর সঙ্গে তালো ব্যবহার, প্রতারণার আশ্রয় না নেওয়া, ধূমপান থেকে বিরত থাকা ইত্যাদির আদেশ-উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হন, ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে তা চর্চা না করেন তাহলে কনিষ্ঠদের নিকট তা অনুপ্রেরণা বা অনুকরণীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না। হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ববোধের বিষয়টি বাস্তবে কথা-কাজে মিল রেখে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে তা অনুশীলন বা চর্চার মাধ্যমে শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের কাছে দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে পারলে তা তাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে। অন্যথায় শুধু উপদেশ-আদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা কথনোই পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য বা অন্য কাউকেই অনুপ্রাণিত করতে পারে না।
সামাজিকতা ও আত্মীয়তার মর্যাদা: মানুষকে তার প্রয়োজনের তাগিদেই পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের সব ধরনের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করতে হয়। সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিটি মানুষের প্রতিবেশী ও সমাজের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে, আত্মীয়স্বজনের প্রতি রয়েছে অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব-কর্তব্য। প্রতিবেশীসহ আত্মীয়স্বজনের বিপদে-আপদে, সুথে-অসুখে, আচার-অনুষ্ঠানে
পাশে থেকে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি মহাপবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা এসব দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে ভবিষ্যতে পারিবারিক ও সমাজব্যবস্থায় কলহ বিবাদ দূর করার কাজে সম্পৃক্ত করে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ সম্প্রসারিত করাসহ ধনী-গরিব আত্মীয়স্বজন একে অন্যের প্রতি যথাযথ ছক আদায়ে সদা জাগ্রত থাকার উৎসাহ প্রদান করা সম্বল।
ধর্মীয় অনুশাসন, ধর্মান্ধতা কুসংস্কার: শিশুদের ধর্মীয় চর্চা এবং সাংস্কৃতি অনুশীলন শুরু হয় বাবা-মা তথা পরিবারের বড়দের অনুকরণের মাধ্যমে। ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক চর্চার বিষয়ে পরিবারের শিশু-কিশোররা সর্বদা বয়োজ্যেষ্ঠদের অনুকরণ করে থাকে। লক্ষ করলে দেখা যায়, মুসলিম পরিবারে যেসব বাবা-মা, বড় ভাইবোন নিয়মিত নামাজ আদায় ও রোজা রাখেন, সে পরিবারের শিশুরাও বুঝে না বুঝে জায়নামাজে বসে নামাজে অংশগ্রহণ এবং অসহনীয় ক হলেও রোজা রাখার চেষ্টা করে। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীর শিশুরা বড়দের সঙ্গে মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডায় একই আচরণ করে থাকে। এতে প্রতীয়মান হ্যা, ধর্মীয় অনুশাসন বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলার বিষয়টি মুখে বলে-কয়ে নয়, বড়দের দ্বারা তা চর্চার মাধ্যমে ছোটদের মন-মগজে প্রবেশ করানো সহজতর হয় এবং এ শিক্ষা চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। যেসব পরিবার কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মান্ধ পরিবারের শিশু-কিশোররা হয়েও সে ধর্মান্ধতা বা কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। ধর্মান্ধতার বশবর্তী হয়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা যখন অন্যের ধর্ম-সংস্কৃতিকে হেয় করার মানসে প্রতিনিয়ত সমালোচানার চর্চা করে, সে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরা একই মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং তাদের ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারমুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বড়দের এ ব্যাপারে যথাযথভাবে চর্চার মাধ্যমে প্রকৃত পথ প্রদর্শন করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে ধর্মীয় উগ্রতা, উন্মাদনা এবং কুসংস্কার সমাজকে অস্থির ও অশান্তির অন্ধকার পথে পরিচালিত করবে, যা সুস্থ ও শান্তিময় সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে মারাত্মক অন্তরায়। পরিবারের মধ্যে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমেই শুধু স্বীয় সংস্কৃতিসহ সব ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধসমৃদ্ধ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব
আত্মাসচেতনতা WHO কর্তৃক নির্ধারিত ১০টি জীবন দক্ষতার মধ্যে আত্মসচেতনতা অন্যতম জীবন দক্ষতা। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা যখন নিজের জীবনকে ভালোবেসে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনাসহ শরীর-স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন খাদ্যাভ্যাস তৈরি করেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, অন্যের কথা বা অপপ্রচারে না দিয়ে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে নিজের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা সচেতনতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জলবায়ুর ভারসমাপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখার মতো সব ধরনের
গঠনমূলক কাজে নিজে ও পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা প্রদান করেন, দুঘটনার আশঙ্কাজনিত কাজকর্মে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত না করেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব-বাস্তবতার নিরিখে তরুণ-তরুণীদের জীবন পরিকল্পনা (Career Plan) সাজাতে সহযোগিতা করেন এবং সর্বোপরি শিশু-কিশোরদেরকে সুশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহলে আমাদের সমাজে আত্মসচেতনতাবোধ সমৃদ্ধ নতুন প্রজন্ম গড়ে ওঠা
সম্ভব। আজকের বয়োজ্যেষ্ঠরা ভিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীকে যেভাবে আত্মসচেতন হতে করবেন আইনেরাই রোদের কনিষ্ঠজনদেরকে একইভাবে সঠিক পথ দেখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের আত্মসচেতনতাবোধই পরিবার তথা সমাজ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, রোগবালাই দূর করার পাশাপাশি সচেতন নাগরিক সমাজ তৈরি করে রাষ্ট্রীয় সত্যতা বিনির্মাণে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানসহ চলার পথে কাঙ্ক্ষিত আচরণ; সামাজিক জীব হিসেবে আমরা বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, নানাবিধ ব্যস্ততায় বা প্রয়োজনের তাগিদে উন্মুক্ত স্থানসমূহে যেমন-হাটবাজার, রাস্তাঘাট এবং গণপরিবহনে অবস্থান বা চলাফেরা করি। পথিমধ্যে আমাদেরকে বয়স্ক, তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, ভিখারি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নিম্নপদস্থ কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, সমাজসেবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, যেমন-গাড়ি/রিকশাচালক, বাসের সহকারী বা কনডাক্টর, দোকানদার, পথচারীর সংস্পর্শে/সান্নিধ্যে আসতে হয়। চলার পথে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরাও আমাদের সফরসঙ্গী হয়ে থাকে। যাত্রাপথে বা উন্মুক্ত স্থানে বয়োজ্যেষ্ঠরা যেরূপ আচার-ব্যবহার করেন, অর্থাৎ অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, বয়সভেদে প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধা, স্নেহ-ভালোবাসা, অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা প্রদর্শন করেন, তাহলে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরা সেরূপ আচরণে অভ্যন্ত হতে থাকে। অনেক বিষয় রয়েছে, যেমন-চলার পথে
বয়োজ্যেষ্ঠরা যদি মানুষের সঙ্গে সর্বদা বিনয়ী আচরণ করেন, যেখানে সেখানে থুতু, ব্যবহৃত টিস্যু পেপার, বোতল, পলিথিন ব্যাগ, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি অনির্ধারিত স্থানে না ফেলে সঠিক স্থান বা ডাস্টবিনে ফেলার চেষ্টা করেন, তাহলে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরা ছোট ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো একইভাবে চর্চা করে সমাজে পরিবেশবান্ধব জীবনাচার গঠনে আমূল পরিবর্তন আনয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পথিমধ্যে এবং উন্মুক্ত
পরিবেশে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মার্জিত আচার ব্যবহার, পরিমিতিবোধ, শৃঙ্খলাবোধ ইত্যাদি থাকায় কনিষ্ঠ সদস্যরা ভুল শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে বেড়ে উঠতে পারে, যা সভ্য সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণের অন্তরায়ের পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবান, আত্মবিশ্বাসী, সৎ, নীতিমান, কর্মঠ, যোগ্য, পরধর্ম ও পরমতসহিষ্ণু, আচার-আচরণে মার্জিত, ভদ্র, নম্র ও বিনয়ী, আত্মসচেতন, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারমুক্ত, নারী-শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল, দরিদ্র অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মী, গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন, অসাম্প্রদায়িক, সুস্থ স্বাভাবিক প্রজন্ম গঠনে মা-বাবাসহ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের যথাযথ জীবনাচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের সুস্থ স্বাভাবিক মার্জিত শিষ্টাচার-সংবলিত সামগ্রিক আচরণ বিনির্মাণে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে পরিবারের বয়স্কজনদের দ্বারা প্রদর্শিত পথ বা অনুশীলনের ভূমিকা অপরিসীম। পরিবারের গুরুজনরা নিজেরা ভুল পথ অনুসরণ, অবিবেচনাপ্রসূত আচার-ব্যবহার চর্চা করে কনিষ্ঠদের সঠিক পথে চলার আদেশ-উপদেশ দিলে তা শতভাগ বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। মোদ্দা কথা পরিবারের বয়স্করা তাদের চর্চিত আচরণের মাধ্যমে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের ভবিষ্যৎ আচরণের রূপরেখা নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর, সৃজনশীল, নান্দনিক ও মানবিক সমাজ গঠনে বাবা-মাসহ পরিবারের সব বয়স্কজনকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।