বৈঠকে নেতারা বলেন, দল ক্ষমতায়, তাই সবকিছুতে খবরদারি করা, থানায় গিয়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আসামিদের ছাড়িয়ে আনা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বাধা কিংবা হস্তক্ষেপ করা, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য ইত্যাদি কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে, আবার সংগঠনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান তাদের উদ্দেশে বলেন, ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক হওয়া উচিত রেললাইনের মতো। দুটো লাইন পাশাপাশি চলবে। কিন্তু একটা আরেকটাকে স্পর্শ করতে পারবে না। ক্ষমতাসীন দল যদি এই চর্চাগুলো করতে পারে, তাহলেই গণতন্ত্র বিকশিত হয়, দলও শক্তিশালী হয়।
নেতারা অভিযোগ করে বলেন, সরকার গঠন করার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু সুযোগসন্ধানী দলের পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সঙ্গে মৌসুমি কিছু মতলববাজ ক্ষমতার চারপাশে মৌমাছির মতো ভিড় করছেন। অনেক নেতাকর্মী সাংগঠনিক কাজের চেয়ে হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট দখলে বেশি মনোযোগী। কিছু বিভ্রান্ত কর্মী শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার জন্য তদবির, টেন্ডার আর নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য শুরু করছেন। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন তারেক রহমান। নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম আর অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। জনগণের রায়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এখন কোনো নেতা বা কর্মী অপকর্ম করলে এর দায় যেমন দল নেবে না, তেমনি ওই নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতেও কোনো কার্পণ্য করবে না। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে তারেক রহমান নানা দিকনির্দেশনা দেন। এর মধ্যে সবার আগে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সেখানে জনপ্রিয়তাকেই প্রধান মাপকাঠি করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রার্থী বাছাইয়ে থানা-উপজেলা নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে সমস্যা হলে জেলা পর্যায়ের নেতারা সমাধানের চেষ্টা করবেন। তারা ব্যর্থ হলে বিভাগীয় নেতারা চেষ্টা করবেন। তারাও ব্যর্থ হলে কেন্দ্র থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে। তবে একক প্রার্থী বাছাইয়ে কিংবা সমর্থন জানাতে এখন থেকেই সবাইকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারেক রহমান।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে নেতাকর্মীদের সতর্কতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, তারা কোনোভাবেই আওয়ামী আমলের নির্বাচন ব্যবস্থায় ফিরবেন না, যেখানে জনগণের জনমতের প্রতিফলন ছিল না। ভবিষ্যতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সরকার কঠোর থাকবে। কোনো কারচুপি হবে না সামনের নির্বাচনে। তাই কেউ যদি মনে করেন, দল থেকে সমর্থন পেলেই জনপ্রতিনিধি হবেন, তাহলে সেটি ভুল হবে। জনগণের মতামতের প্রতি এই সরকার সবসময় সম্মান জানাবে।
তৃণমূল পর্যায়ে কোন্দল নিরসনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। সেখানে বলা হয়েছে, নিজেদের মধ্যে কোন্দল থাকলে কোথাও জয়লাভ করতে পারবেন না; সেটি নির্বাচন হোক কিংবা রাজনীতি হোক। নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে অবশ্যই অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে ঐক্য গড়তে হবে।
জনগণের দোরগোড়ায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। সেখানে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন আর রাষ্ট্র সংস্কারে নেওয়া পদক্ষেপকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষত, সরকারের নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচির মতো ভালো কাজগুলোর উদ্দেশ্য ও এর সুফল নিয়ে জনগণের কাছে যেতে বলেছেন তারেক রহমান।
জয়পুরহাট জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও জয়পুরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক মাসুদ রানা প্রধান সমকালকে বলেন, এটি মূলত সাংগঠনিক বৈঠক ছিল। সেখানে দলের সাংগঠনিক অবস্থানসহ আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।