
খাবার বরাবরই এমন এক ভাষা, যার মাধ্যমে আমরা অনেক না-বলা অনুভূতি প্রকাশ করি। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, ‘তোমাকে খুব মিস করেছি’, কিংবা ‘তোমার কথা ভেবেছি’—এসব অনুভূতির নীরব বাহক হয়ে ওঠে প্রিয় কোনো খাবার। আধুনিক জীবনে কুরিয়ারে এখন চাটনি পাঠানো যায়, গোয়ার মাপুসা মার্কেটের বিখ্যাত চোরিজোও হয়তো মুম্বাইয়ে পৌঁছে যায় মুহূর্তেই। কিন্তু তাতেই কি সেই অনুভূতি পৌঁছে যায়?
একটি জিনিস নিজ হাতে বহন করার মধ্যে থাকে আলাদা আন্তরিকতা। আপনি সেটি বেছে নিয়েছেন, যত্ন করে গুছিয়েছেন, বিমানবন্দর ও দীর্ঘ যাত্রাপথ পেরিয়ে সঙ্গে করে এনেছেন। উপহার গ্রহণকারী যখন বাক্সটি খুলবেন, তখন সেই যত্ন ও ভালোবাসা তিনি অনুভব করতে পারবেন।
মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী নীলাম ফুডল্যান্ড–এর কর্ণধার নানজি শাহ মনে করেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে অনুভূতিতে। তাঁর ভাষায়, ‘কেউ যখন নিজের হাতে কোনো খাবার বেছে নেয়, ব্যাগে ভরে বিমান বা ট্রেনে বহন করে নিয়ে আসে, তখন সেটি শুধু একটি খাবার থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ভালোবাসার প্রকাশ।’
তিনি জানান, প্রতিদিনই এমন ক্রেতা আসেন, যারা নিজেদের জন্য নয়, দূরে থাকা সন্তান, আত্মীয় বা বন্ধুর জন্য কেনাকাটা করেন। কেউ বিদেশে থাকা ছেলের জন্য নাশতা কেনেন, কেউ মেয়ের জন্য শৈশবের প্রিয় খাবার।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ট্রিনকাস–এর আনন্দ পুরির মতে, এই শহর এখনো সেই পুরোনো সংস্কৃতিটুকু ধরে রেখেছে। সুতো দিয়ে বাঁধা সাদা বাক্সে সন্দেশ, কিংবা ‘মিষ্টি’ নামের দোকানের মিষ্টি দই—এসব এখনো মানুষের প্রিয় উপহার। আর তাঁর নিজের সবচেয়ে পছন্দের উপহার হলো পাড়ার মুড়িওয়ালার বানানো মশলা আর হালকা সরিষার তেল মেশানো এক প্যাকেট মুড়ি।
জ্যোতি কুমারীর কথায়, “ভ্রমণ থেকে ফিরলে আপনার বন্ধুরা ফ্রিজ ম্যাগনেট চায় না, তারা চায় খাবার। এখন প্রায় সবকিছুই কয়েক মিনিটে ডেলিভারি করা সম্ভব। কিন্তু আন্তরিকতা আর যত্নের উপহার এখনো সময় নিয়েই পৌঁছে দিতে হয়, আর মানুষ সেই পার্থক্য ঠিকই বুঝতে পারে। তাই পরেরবার কাউকে উপহার দিতে চাইলে শুধু ফ্রিজ ম্যাগনেট নয়, সঙ্গে নিয়ে আসুন ভালোবাসাভরা খাবারের পুরো সম্ভার।
দিল্লির রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তা রাজন শেঠির ভাষায়, ‘আজ সবকিছুই সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু আন্তরিকতা কখনো ডেলিভারি করা যায় না। যত্ন করে সাজানো একটি খাবারের বাক্স মানুষ সারাজীবন মনে রাখে।’
খাবার ভারতীয় সংস্কৃতিতে সব সময়ই আবেগ প্রকাশের একটি ভাষা। অনেক সময় ‘তোমার কথা ভেবেছি’—এই কথাটি বলার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হয়ে ওঠে একটি ছোট্ট খাবারের প্যাকেট।
প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, প্রিয়জনের জন্য নিজের হাতে খাবার বয়ে আনার এই ছোট্ট ভালোবাসার রীতিকে কোনো অ্যাপ প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। কারণ, অর্ডার করা সহজ—কিন্তু নিজের হাতে বহন করে আনা, সেটিই ভালোবাসা।