
হামিদ হাসান কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি পদ ধরে ১১তম গ্রেড দেওয়া, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি এবং ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন-এই তিন দফা দাবিতে সারা দেশের ন্যায় কটিয়াদী উপজেলায় ১২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি এবং গত ১ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করেছেন।
বার্ষিক পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে এই কর্মবিরতি শুরু হওয়ায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কটিয়াদী উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন , “সরকারের আশ্বাসে আমরা আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় আমরা হতাশ। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা লাগাতার কর্মবিরতি চালিয়ে যাব এবং বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করব। এদিকে ”হঠাৎ করে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চরম উদ্বেগে পড়েছেন।
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) সকাল ১০ টায় চরঝাকালিয়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে স্কুল আঙিনায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ভিড়। অপরদিকে অফিস কক্ষে বসে শিক্ষিকারা কর্মবিরতি পালন করছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দুদিন ধরে পূর্বের দেয়া রুটিন অনুযায়ী প্রিপারেশন নিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে ঠিকই কিন্তু তাদেরকে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কেউই সঠিকভাবে বলছে না কবে থেকে পরীক্ষা শুরু হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন তারা পরীক্ষা নেবেন না সেটা সুনির্দিষ্ট করে আমাদেরকে জানিয়ে দিলেই তো হয়, আর কবে পরীক্ষা শুরু হবে সেটা বলে দিলেই তো আমাদের এতো ভোগান্তির শিকার হতে হয় না।
শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এ খবর শুনে বিদ্যালয় থেকে ফিরে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দুই দিন ধরে পরীক্ষা স্থগিত থাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীরা। তবে কবে নাগাদ নতুন করে পরীক্ষা শুরু হবে, এবিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছেন না। এতে আরো চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সচেতন অভিভাবক মহলে।
চরঝাকালিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন দুদিন ধরে বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে আসছি আর ফিরে যাচ্ছি কিন্তু তারা ভালোমন্দ আমাদের কিছুই বলছেন না। এতে আমরা সচেতন অভিভাবক মহলের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আরেক অভিভাবক বলেন তারা তাদের স্বার্থে দুদিন পর পর আন্দোলন ও কর্মবিরতি সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে বছরের শেষে আমাদের সন্তানদের বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রেখে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করবে এটা আমরা মেনে নিতে পারিনা। এখন এই বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ হওয়ায় ওদের পড়ালেখায় অনেক ক্ষতি হচ্ছে।
অন্যদিকে শিক্ষকরা জানান, এর আগে সরকার পক্ষ থেকে ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ ও অন্যান্য জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, যার ভিত্তিতে শিক্ষকরা কর্মসূচি স্থগিত করেন। কিন্তু সেই আশ্বাস অনুযায়ী ১১তম গ্রেডের প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় এবং অন্যান্য দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে আবার কর্মবিরতিতে ফিরেছেন। দুই দিন ধরে পরীক্ষা স্থগিত থাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীরা।
মোঃ মামুনুর রশিদ নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘এই আন্দোলন পরীক্ষার আগে বা পরে করা যেত না? বাচ্চারা যখনই শুনছে পরীক্ষা হচ্ছে না, স্থগিত; এখন তাদের আর পড়ায় মন বসছে না। আপনারাই বলুন চোখের সামনে এগুলো দেখে কী করে ধৈর্য ধরবেন অভিভাবকেরা?’
সচেতন মহলের কেউ কেউ বলছেন ‘দাবি আদায়ের জন্য বাচ্চাদের পরীক্ষা স্থগিত করার কোনো মানেই হয় না। এটা কর্মবিরতি ও বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করে মূলত তারা সরকারকে জিম্মি করে তাদের দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাছাড়া আন্দোলনরত দের মধ্যে অনেকে এস এস সি পাশ শিক্ষক রয়েছেন। উনারা ১১ তম গ্রেড দাবি করেন কিভাবে ? শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। একজন শিক্ষকের সম্মান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই দাবি আদায় করতে হলে রাজনৈতিক মাঠে গিয়ে আন্দোলন করুন। বেতনে না পোষালে চাকরি ছেড়ে নতুন ও যোগ্যদের সুযোগ দিন।’
কর্মবিরতি চলতে থাকলে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিতের পাশাপাশি পুরো শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
এবিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি তো দুদিন আগেই সকল প্রতিষ্ঠানে পরিক্ষার খাতা ও প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দিয়েছি সেইসাথে সকল প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানিয়েছি যেকোনো ভাবেই হোক রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা সম্পন্ন করতে।
এদিকে কটিয়াদী চরঝাকালিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী আমি একাই পরীক্ষা নেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম কিন্তু সহকারী শিক্ষকরা বলেছেন তাদের দাবি আদায় না হলে ওইসব পরীক্ষার খাতাও তারা মূল্যায়ন করতে পারবেন না।
অপরদিকে কটিয়াদী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অভিভাবকরি উত্তেজিত হয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) লাবনী আক্তার তারানা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসে তা সমঝোতার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তিনি অভিভাবকদের আস্বস্ত করেন আগামীকাল থেকে যথাসময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।