
মো. নূরে আলম ছিদ্দিকী,নৌবাহিনী কমান্ডার,
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে, ভালোমন্দ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই হচ্ছে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা। সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিটি মানুষ যে কোনো ঘটনাকে যৌক্তিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে
শিক্ষাই ক্ষাই শক্তি, শিক্ষাই সম্পদ ও সমৃদ্ধি। বিজ্ঞানভিত্তিক সময়োপযোগী ও জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ব্যক্তির মেধা বিকাশের শক্তি জোগায়। আর ব্যক্তির সমষ্টিগত শক্তিই রাষ্ট্রের মূল সম্পদ-যার মাধ্যমে রাষ্ট্র হয় শক্তিশালী, উন্নত, টেকসই ও আধুনিক। উন্নত সমাজ তথা রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় নাগরিকেরা পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হলেও প্রকৃত সম্পদে পরিণত না হয়ে, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হলো-নৈতিক গুণাবলিসমৃদ্ধ ও জীবন দক্ষতায় উন্নত জনগোষ্ঠী তৈরি। বিভিন্ন গবেষণা বিশেষ করে WHO কর্তৃক নির্ধারিত ১০টি জীবন দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে থাকে। নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ, আর নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন জনগণ যদি উন্নত জীবনদক্ষতার অধিকারী হয়, সেই সমাজ বা রাষ্ট্র কখনোই পিছিয়ে থাকে না।
জীবনদক্ষতায় উন্নত মানুষ ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে সফলতা অর্জনে সক্ষম। গুণমানসম্পন্ন নাগরিক তৈরির মানসে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবনেই প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা অর্জন করতে পারে। এছাড়া সুশিক্ষিত, সৎ ও কর্মমুখী জাতি গড়ে তোলার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। আর গ্রিক দার্শনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের মতে, ‘সুশিক্ষিত নাগরিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ’। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নৈতিকতা ও জীবনদক্ষতার নিয়মিত অনুশীলনই নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন, সময়োপযোগী এবং জীবনদক্ষতায় উন্নত মানবসম্পদ প্রস্তুতের পূর্বশর্ত। জীবনদক্ষতায় উন্নত, নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গঠনমূলক অবদান রাখতে পারে। প্রসঙ্গক্রমে জীবনদক্ষতার দিকসমূহ সংক্ষেপে উপস্থাপন করছি:
আত্মসচেতনতা: আত্মসচেতনতা মানুষের জীবনের অন্যতম দক্ষতা, যা তাকে সব পরিস্থিতিতে সঠিক পথে পরিচালনা করে। এটি ব্যক্তিজীবনে সর্বস্তরে ঝুঁকিমুক্ত সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যে কোনো প্ররোচনা বা প্রলোভন এড়িয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যাতে সচেতনভাবে নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করে জীবনপরিকল্পনা সাজাতে পারে, তার জন্য প্রয়োজন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির আওতায় আত্মসচেতনতা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। লক্ষণীয়, আত্মসচেতনতার অভাবে তরুণসমাজ সম্পদে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে পথভ্রষ্ট হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে, তারাই হয় পরিবার ও সমাজের ভোগান্তির কারণ। পক্ষান্তরে, আত্মসচেতনেরা সর্বদা গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত থাকে; ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে
সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা: কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে, ভালোমন্দ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই হচ্ছে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা। সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিটি মানুষ যে কোনো ঘটনাকে যৌক্তিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে। এ দক্ষতা অর্জনে শিক্ষাক্রমে যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের মতো বিষয়াদি অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। অন্ধবিশ্বাসমুক্ত জনগোষ্ঠী প্রগতিশীল ও উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সৃজনশীল চিন্তাভাবনা সৃজনশীল চিন্তাশক্তি জটিল সমস্যা সমাধানে গতানুগতিক ধারার পরিবর্তে নতুনভাবে ভাবতে এবং বিকল্প পথগুলো ব্যবহার করতে সহযোগিতা করে। শিক্ষাজীবনে এ দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে বয়স্কাবস্থায় পেশাগত জীবন অর্জন করা
প্রায় অসম্ভব। শিক্ষা কারিকুলামে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু থাকলেও তা পরিবর্তন, পরিমার্জনের মাধ্যমে সময়োপযোগী করার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের পেশাগত জীবনের সব স্তরে কাজের পরিমাণ ও গুণমানের উন্নতি সাধন ও কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জনে সৃজনশীলতার বিকল্প নেই
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে সর্বদা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই উন্নতির চাবিকাঠি। বলা হয়, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’। কঠিন পরিস্থিতিতে বিচলিত না হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতার পরিচয় দেওয়া সম্ভব হলে কাজে সফলতা অর্জন সহজতর হয়। শিক্ষণ-শিখনপ্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের যৌক্তিক অ্যাপ্রোচ, স্বজ্ঞাত অ্যাপ্রোচ, সীমাবদ্ধ যৌক্তিক অ্যাপ্রোচ, আচরণগত অ্যাপ্রোচ, দলগত অ্যাপ্রোচসমূহ অন্তর্ভুক্ত করে তা অনুশীলনের ব্যবস্থা রাখলে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের গুণাবলিসমৃদ্ধ জনসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
যোগাযোগ দক্ষতা: যোগাযোগ দক্ষতা বা সফট স্কিলের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে এবং নিজের প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে। ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে যে কোনো বিষয়ে আলোচনা, দরকষাকষি এবং সমঝোতার ক্ষেত্রে কৌশলগত বিষয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ়করণে যোগাযোগ দক্ষতার গুরুত্ব অপরিসীম। স্থান-
কাল-পাত্রভেদে সঠিক শব্দচয়ন ও যথাসমীচীন উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিস্থিতিও নিজের আয়ত্তে রাখা সম্ভব। এ দক্ষতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, তাই শিক্ষার সর্বস্তরে এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। লক্ষণীয়, শিক্ষার্থীদের অনেকে পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করেও যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি থাকায় নিজেকে সঠিক অবস্থানে তুলে ধরতে এবং পেশাগত জীবনে যথাযোগ্য অবদানও রাখতে পারে না।
আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক: অন্যের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক স্থাপন, কার্যকরী যোগাযোগ রক্ষা, সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে সম্পর্কের ভিত্তি টেকসইকরণ, সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দ্বন্দ্ব-বিভেদের ধারণা পরিহার করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াকে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের দক্ষতা বলা যায়। এ দক্ষতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব হলে সমাজের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হ্রাস পাবে এবং নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হবে। বৃহত্তর জনসমাজের মধ্যে এ গুণাবলি সন্নিবেশ করানোর লক্ষ্যে শিক্ষণ-শিখনপ্রক্রিয়ায় তা বিষদভাবে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।
সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাস্তব জীবনে মানুষ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়া সমস্যা সমাধানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ প্রায় অসম্ভব। লক্ষণীয়, অজ্ঞতাবশত অধিকাংশ মানুষই সমস্যার মূল কারণ না খুঁজে সমস্যার উপসর্গ নিয়ে কাজ করে, তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও সমাধানের বৈজ্ঞানিক ধাপসমূহ অনুসরণ করে না, বিকল্পপথ না খুঁজে প্রথাগতভাবে সমাধানের চেষ্টা করে। আবার, যে সমস্যা সমাধানে দলগত বুদ্ধি-পরামর্শের প্রয়োজন, তা এককভাবে চেষ্টা করায় যথাযথ সমাধানও হয় না। শিক্ষাজীবনে এ দক্ষতা অর্জন ও অনুশীলনের সুযোগ থাকলে পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ সমস্যারই সামাজিক সমাধান সম্ভব হবে
এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা সহানুভুতি ও সহমর্মিতা সমার্থক মনে হলেও এ দুইটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সহানুভূতি হলো-দূর থেকে অন্য কারোর কষ্টে সাময়িকভাবে দুঃখ অনুভব করা, পক্ষান্তরে
দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তির মতো করে পরিস্থিতির মূল্যায়ন, হৃদয়ে ধারণসহ তার সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার নামই সহমর্মিতা। মানুষের মধ্যে এ দুইটি গুণ বিদ্যমান থাকলে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়, বিপদ-আপদে, সুখ-দুখে সবকিছু ভাগাভাগি করে কঠিন সমস্যাও সহজভাবে সমাধান হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিকরা হয় ঐক্যবদ্ধ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির মাধ্যমে এ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকলে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি ও সহমর্মিতাবোধ জাগ্রত হবে।
চাপ মোকাবিলার দক্ষতা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শান্ত ও কার্যকর এবং মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যেও অবিচল থেকে কার্যক্রম পরিচালনাসহ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই চাপ মোকাবিলার দক্ষতা। চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল বা পদ্ধতি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিক্ষাজীবনে একক ও দলীয়ভাবে চাপ মোকাবিলার দক্ষতা অর্জনে পর্যাপ্ত অনুশীলনের ব্যবস্থা থাকলে দৈহিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব।
আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আবেগ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়ার জটিল মিশ্রণ, যা আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ সাধারণত আবেগকে গঠনমূলক কাজে ধাবিত করে, পক্ষান্তরে এ বিষয়ে দুর্বল মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে প্রায়শই ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাস্তবতা ও আবেগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার ক্ষমতাই আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা, যা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। লক্ষণীয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণে কৌশলী ব্যক্তিবর্গ সর্বদা কল্যাণমূলক কাজে আগ্রহী, পক্ষান্তরে অনিয়ন্ত্রিত বা মাত্রাতিরিক্ত আবেগপ্রবণ ব্যক্তিগণ সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে মারাত্মক ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হয় না। নৈতিক শিক্ষা
ও জীবনদক্ষতার সমন্বয় : জীবনদক্ষতাসমৃদ্ধ জনসমাজ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হলে জাতীয় পর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যায় জীবনদক্ষতাগুলো মানুষ তার প্রয়োজনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় পথেই ব্যবহার করে চরিত্রবান জনগোষ্ঠী দ্বারা সাধারণত সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়, এমন কাজ সম্পাদিত হয় না। নৈতিকতা ও জীবনদক্ষতাসমূহের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রতিটি স্তরে এ বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। উন্নত জীবন দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিক সমাজ যদি আত্মমর্যাদাশীল, বিবেকবান, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, ধৈর্যশীল, কর্মমুখী, পরিশ্রমী, দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ, অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিনয়ী, ধর্মপরায়ণ, কুসংস্কারমুক্ত, উদার, গণতন্ত্রকামী, দেশপ্রেমিক, মিতব্যয়ী এবং আত্মবিশ্বাসী হয়, তাহলে সমাজ তথা রাষ্ট্র হবে উন্নত ও কল্যাণকর।
শৈশব-কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকালই নৈতিক শিক্ষা অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। শৈশবে পরিবার থেকে শেখা শুরু হলেও ছাত্রজীবনে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি গুরুত্বসহকারে শেখে এবং চর্চা করে। অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের দেশের এক শ্রেণির শিক্ষিত মানুষ জীবনদক্ষতাসম্পন্ন হলেও নীতিনৈতিকতার সঙ্গে তা সমন্বয় ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই অসততা, মাত্রাতিরিক্ত লোভ, আত্মত্মসম্মান ও মূল্যবোধের অভাব, নৈতিকতার অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজে অবিচার, অনাচার, দুর্নীতির মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। এখানে নৈতিক শিক্ষা প্রসঙ্গে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মূলভাবটি প্রণিধানযোগ্য, ‘চরিত্র ছাড়া জ্ঞানবৃক্ষ কেবলই বিষফল প্রসব করে’। আমাদের সমাজও প্রকৃত নৈতিক শিক্ষার অভাবে বিশৃঙ্খলা, ব্যভিচার, অনিয়ম, অত্যাচার, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সর্বোপরি দুর্নীতির মাত্রা অসহনীয় পর্যায় পৌঁছে গেছে। নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যদি জীবনদক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়, সে জাতি যুক্তিসংগত কারণেই উন্নত, আধুনিক, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে স্থান করে নিতে পারে। মোদ্দাকথা, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও জীবনদক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার যথাযথ সমন্বয় ঘটানোই জনহিতকর সমাজ বিনির্মাণের মূলমন্ত্র।